পেটে ভাত নাই, ঘরে থাকুম ক্যামনে ?


Published: 2020-04-08 19:32:26 BdST, Updated: 2020-06-03 04:51:28 BdST

আশরাফুল ইসলামঃ “পুলিশ যহন চা স্টলের ছাইলায় (ছেঁড়া পলিথিন, কাগজ, তেনা আর ভাঙা চাটাই দিয়ে তৈরি চালা) একটা বাড়ি দিল, আমার কইলজাডায় ছ্যাত কইরা উঠলো। বাইরইয়া দেহি আইসালডাও(চুলা) ভাইঙ্গা থুইছে। চা বেইছা আমার প্যাট চলে, তা বন্ধ অইলে আমি বাঁচুম কি খাইয়া ?

কান্না জড়িত কণ্ঠে কথা গুলো বলছিল গ্রাম্য বাজারের ছোট্ট চা স্টলের মালিক স্বামী পরিত্যাক্তা রাবেয়া খাতুন।করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সরকারী ছুটি চলছে ,চলবে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। শহরের মতই গ্রামের মানুষের চলাচলেও রয়েছে সরকারী নিষেধাজ্ঞা। খুব জরুরী প্রয়োজনীয় পন্যসামগ্রী ব্যাতিত সকল দোকান বন্ধ। বন্ধ রয়েছে রাবেয়াদের মত ক্ষুদ্র উদ্যক্তাদের চায়ের দোকানও।

টানা ৭ বছর ঢাকায় ঝিয়ের কাজ করার পর রাবেয়া গ্রামে ফিরেছেন মাস ছয়েক হলো। আজ থেকে ৮-৯ বছর আগে মাতাল স্বামীকে তালাক দিয়ে এক ছেলে নিয়ে বাবার বাড়ি উঠেন রাবেয়া। কিন্ত বাবার অবস্থা ভালো না থাকায় সকল সুখ বিসর্জন দিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ঝিয়ের কাজের পাশাপাশি নিজে রান্না করে ভাসমান শ্রমজীবীদের কাছে খাবার বিক্রি করতেন রাবেয়া। বেশ কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামে ফিরে চায়ের দোকান বসিয়েছেন। বিধি বাম সেই চায়ের দোকানটাই লকডাউনের দোহাই দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভেঙ্গে দিয়ে গেলো।

কদিন আগেই ৭’শ ট্যাহা দিয়া ছাইলা বানাইছি। আইসাল বান্দাইছি। সামনে বিষ্টি বাদলের দিন,আমি এহন কিবায় চলুম? সরকার কি আমায় খাওন দিবো? পেটে ভাত নাই, ঘরে থাকুম ক্যামনে? রাবেয়ার এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই ,আমাদের জানা নেই। রাবেয়ার ছলছল চোখের পানে তাকাতে পারিনি, সে চোখে আরও অজস্র অব্যাক্ত কথা ঘাটি গেড়েছে।

মুদি দোকানদার রফিক আলীর অবস্থা দিনমজুরদের মত না হলেও তিনিও খুব একটা ভালো নেই। তিন মেয়ে, এক ছেলে, বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী নিয়ে রফিক আলীর ৭ সদস্যের পরিবার। মুদি দোকানের আয়েই চলছে সংসার। কিন্ত বর্তমান অবস্থায় তিনিও দোকান খুলতে ভয় পান। কখন পুলিশ আসে আর কখন যেন গুনতে হয় হাজার টাকা জরিমানা। সংসারের দায়ে তবু দোকানের এক ঝাপ খুলা রাখেন, পুলিশ আসছে শুনলেই বন্ধ করে ভোঁ দৌড়। দোকানদার পুলিশে অনেকটা কানামাছি কানামাছি খেলা। মাঝে মাঝে দোকানের বাহিরে তালা ঝুলিয়ে ভিতরেই বসে থাকেন রফিক আলী। সারাদিন শেষে বিক্রিত অর্থেই উনুনে হাড়ি উঠে ,তাকে দোকান যে খুলতেই হবে।

“পুলিশ তো খালি (শুধু) বাইড়ায় গরিব গো ।মহাজন গো বাইড়াইতে পারেনা। ১৭০০ ট্যাহার চাইলের বস্তা ২০০০ ট্যাহা বানাইছে এই বিপদের সুময় ,এইসব মাইনসের কাম ।গরিব মানুষ কি খাইয়া বাঁচবো ?”

রফিক আলীর প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের কাছে আছে? প্রশাসনের কাছে আছে? দেশের দুর্যোগে উন্নত বিশ্বের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম কমিয়ে দেয়, কিন্ত আমাদের দেশের একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য গুদামজাত করে কৃত্তিম সংকট তৈরি করে। ভোগ্য পন্যের দাম দ্বিগুণ ত্রিগুন বাড়িয়ে দেয়। এসব দেখার যেমন কেউ নেই ,তেমনি অসাধু ব্যবসায়ীদের মনেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই ।

মানুষদের ঘরে রাখতে সারাদেশেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে তৎপর আছে। প্রান্তিক পর্যায়ে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীও। গ্রাম্যবাজার গুলোতে দোকানপাট সব বন্ধ বললেই চলে। বন্ধ আছে দিনমজুরদের কাজও। ভীষণ বিপাকে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ গুলো।

আসলাম হোসেন রাস্তায় মাটি কাটেন। কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা কাবিখা প্রজেক্টের অধিনে তিনি কাজ করেন। পুরো দেশ লকডাউনে বিপর্যস্ত। আসলাম হোসেনেরও হাতে কাজ নেই ,ঘরে খাবারও নেই, জমানো অর্থও নেই। সারাদিন শুয়ে বসে কাটালেও দুদিন ধরে ঘুরছেন টাকা ধারের জন্য ।এমন মানবিক বিপর্যয়ে কে শুনে কার বিপদের কথা, সবাই যেন নিজেকে বাঁচাতে ব্যাস্ত।

ক্ষিদার জ্বালায় পোলায়হান কান্দিতাছে। দশ-বারো জন মাইনসের কাছে ৫০০ ট্যাহা আওলাদ(ধার) চাইলাম ৫ সের চাইল কিনমু ,কেউ দিল না। এহন এক হাজার ট্যাহা সুইদা কইরা আনলাম। ১ হাজার ট্যাহায় মাসে ৩০০ ট্যাহা সুদ ,আমার একদিনের কামাই দেনাগবো সুদ দিতেই। আসলাম হোসেনের কথা গুলো যেন গ্রামের প্রতিটা দিনমজুরের কথা ,তার ঘরের টানটানি-ই যেন প্রতিটা খেঁটে খাওয়া মানুষের ঘরের অবস্থা। আসলাম হোসেনকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই। তবু সরকারী নিয়ম মানতে তো হবেই। আমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ বাঁচাতেই আমাদের ঘরে থাকতে হবে।

ঘরে থাকলে কি চাইল আহে? প্যাটে খাওন আহে? সব জায়গায় সরকার চাইল দিতাছে, আমগো দিলো কো? প্যাটে ভাত থাকলে সারাদিন ঘরে থাহন যায়, ভাত না থাকলে থাহন যায়না। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার পরিবারে পিছু ১০ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছে ।বরাদ্দ বিতরণে যেন দুর্নীতি না হয় ,কারচুপি না হয় সেই হুশিয়ারিও দিয়েছে ।

তবুও, আসলাম হোসেনের গ্রামের মত অনেক গ্রামেই বরাদ্দের চাল পৌঁছায়নি। গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষ গুলোর মুখের আহার যারা কেড়ে নিচ্ছে তারা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থাকছে। ক্ষুধার্ত মানুষ নাকি বাঘের মত হিংস্র হয়। দুর্ভিক্ষের সময় পেটের দায় মানুষ মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না। এখন যদিও দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে না তবুও ক্ষুধার্ত মানুষের নিধারুন হাহাকার বুঝার মত অনুভূতি কি আমাদের আছে? তিন বেলা গরম খাবার খাওয়া মানুষ গুলোর পক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষদের চোখের ভাষা বুঝা বড়ই কঠিন।

ঢাকা, ০৮ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআই//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।