শাশ্বত একুশ ও বঙ্গবন্ধু


Published: 2020-02-19 18:24:28 BdST, Updated: 2020-08-07 15:36:17 BdST

সৈয়দ নাজমুল হুদাঃ অসম্প্রদায়িক চেতনায় সামনের দিকে দ্বিধাহীন অভিযাত্রী বেশে বাঙ্গালিকে চলার পথে প্রেরণা জোগায় একুশ। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান, তীর্থ ভূমি নিয়ে ভারতবর্ষ গঠিত। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজন। ভারত ও পাকিস্থান নামক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম।

দু’টি ভিন্ন পতাকা। দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র প্রধান। তাদের কর্ম নির্ধারণ পদ্ধতির ভিন্নতা। মন ও মননশীলতার মধ্যে দিয়ে সংস্কৃতিক উন্নত রীতি-নীতি তথা গণতন্ত্রের রাখীবন্ধন। জনগণের আশা প্রত্যাশা ও প্রেরণায় গড়ে উঠা দু’টি ভিন্ন দেশ। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ, জৈনসহ প্রায় ২৬টি ধর্মবিশ্বাসী মানুষের তীর্থস্থান এই ভারতবর্ষ।

আঞ্চলিক রীতি-নীতি ও কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচালিত দেশ দু’টি ধর্মীয় বিশ্বাসে পালিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানসমূহ। এদেশে বিভিন্ন সময় ছোটখাটো সংঘাত, দ্বন্দ্ব-সং*র্ষ হয়েছে, তবে সে সকল বিষয়সমূহ ও ঘটনাসমূহ ক্ষণস্থায়ী। মায়ের সাথে মিশে আছে সন্তানের মুখের ভাষা।

এজন্য বলা হয় মা, মাটি ও দেশ সন্তানের পরম আপনজন। গান্ধীজির যে স্বপ্ন ছিল গোটা ভারতবর্ষকে নিয়ে একটি রাষ্ট্র হিসাবে পরিচালনার কিন্তু ১৯৪৭ সালে মাউন্টব্যাটেনের সাথে র‌্যাডক্লিফের পেনসিলে এ উপমহাদেশের যে মানচিত্র অংকিত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ গোঁজামিল। এ মানচিত্রের মাধ্যমে প্রথমে ভারত পাকিস্থান। তারপর পাকিস্থান থেকে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি স্বাধীনদেশ বাংলাদেশ গড়ে উঠা।

আজ বাংলাদেশ নামক দেশটিতে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অবস্থান। এ ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া রাজা রামমোহন রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এ.কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাসহ অসংখ্যা নেতা, জ্ঞানগুরু ও সমাজ সংস্কারক, সমাজ পরিবর্তনের নেতৃবৃন্দের জন্মস্থান। তবে নবোদিত নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্ঠা জাতির পিতা ইতিহাসের পাতায় এক ও অভিন্ন সত্ত্বা হিসাবে মিশে আছে।

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্থান দেশ দুটি গড়ে উঠে। সর্বপোরি পাকিস্থান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাংলাদেশ নামক দেশটির শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আমরা অসম্প্রদায়িক এবং অকুতোভয় বাঙ্গালী।

পাকিস্থান নামক দেশটির শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা আর ৭ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা ছিল উর্দু। অধিকাংশ মানুষের মায়ের ভাষাকে উপেক্ষা করে নামমাত্র মানুষের মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার এমন হীন ষড়যন্ত্র পৃথিবীতে বিরল। তেমনী মাতৃভাষার জন্য লড়াই করে রক্ত ঝরিয়ে স্বীকৃতি অর্জনের ইতিহাস পৃথিবীর মানচিত্রে আর কোন জাতির আছে কিনা তা অজানা।

একটি কঠিন দেশপ্রেমের অনবদ্য বহিঃপ্রকাশ মহান মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ পরিক্রমা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাই ইতিহাসে ভাষার প্রশ্নে রক্তদানকারী দিনটি একুশ ও স্বাধীনতা অর্জনের কিংবদন্তী অন্যতম নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আমাদের বাঙ্গালী সত্ত্বায় মিশে আছে।

লেখক

 

একুশ শুধুমাত্র একটি শব্দ বা সংখ্যা নয়। একটি চেতনা, বিশ্বাস ও শক্তির বাতিঘর। তাই বলা যায় একুশ ও বঙ্গবন্ধু শব্দ দু’টি মিশে আছে বাঙ্গালির হৃদয়ের মনি কোঠায়। একটি নিষ্পাপ মানব শিশু মাতৃগর্ভে ও প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে মায়ের ভাষা শিখে। এই ভাষার প্রকৃত হকদার হয় শিশুটি।

মহান রাব্বুল আলামিনই বান্দার অন্তরে মাতৃভাষার প্রতি সৃষ্টি করেছেন অকৃত্রিম ভালবাসা, প্রেম ও আকর্ষন। মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে আললাহতায়ালা তার প্রত্যেক নবী রসুল-এর কাছে নিজ নিজ মাতৃভাষা কিংবা জাতি সত্ত্বার ভাষায় প্রেরণ করেছেন কিতাব সমূহ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতালা ঘোষনা করেছেন “আমি প্রত্যেক রসুলকে স্বজাতির ভাষা দিয়ে পাঠিয়েছি যেন তারা তাদের (স্বজাতিকে) সহজে বোঝাতে পারে (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৪)। মানুষ তার মনেরভাব প্রকাশ, আদান প্রদান কিংবা শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজ মাতৃভাষার গুরত্ব ও অবদান অপরিসীম।

এজন্য বলা হয় মায়ের দুধের যেমন বিকল্প নেই তেমনি মাতৃভাষা কিংবা মায়ের ভাষারও কোন পরিপূরক নেই। এদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ধর্ম ভিত্তিকের পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক জাতীয়বাদের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভাষার দাবীতে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ “রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠিত হয়।

ভাষা দিবস পালনকালে বঙ্গবন্ধু ও ৬৯জন ছাত্র নেতাসহ অগনিত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার। হয়েছে শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ। ঐতিহাসিক ভাষা চুক্তি করেও তা রক্ষা করা হয়নি। জোর করে মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র বানচাল হয়েছে। কারাগারে অবস্থান করেও বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের কর্মসূচীসহ সকল নির্দেশনা দিয়েছেন।

খাজা নাজিমদ্দীনের পক্ষ নেওয়ায় বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচীকে বেগবান করেছেন। বঙ্গবন্ধু ও মাতৃভাষা সংগ্রাম পরিষদ হীন ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে আপোষ করেনি।

আজ বাংলাদেশ আত্ম মর্যাদার সমুন্নত এক জাতি হিসাবে বিশ্বের বুঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অন্তর্হীন প্রেরণার নাম একুশ। একুশ শুধু বাংলা বা বাঙ্গালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিয়েছে। একুশ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। একুশ বিশ্ববাসীর ঐক্য ও সম্প্রিতির বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।

১৪ অক্টোবর ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করলে দুর্বার আন্দোলন হয়। এই দূর্বার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২১শে ফেব্র“য়ারী শাসক গোষ্ঠির জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রাণ দিয়েছে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিকসহ নাম জানা অজানা অনেকেই। একুশ আজ সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রেরণার একটি নাম।

বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের সৃষ্টি বা বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। একুশ ও বঙ্গবন্ধু মিশে আছে ইতিহাসের পাতায়। আজ স্বাধীনতার ৪৯ বছর। ২০২১ হবে স্বাধীনতার সূর্বন জয়ন্তী। ২০২০ সাল বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী। বাঙালির সাহস, শক্তি ও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে রবে একুশ ও বঙ্গবন্ধু। এই মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন, আদর্শ ও সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে একুশের চেতনায় আমরা উজ্জীবিত হবো।

একুশ ও বঙ্গবন্ধু হোক মুজিব বর্ষে প্রতিটি বাঙ্গালির ভাল কাজের অঙ্গীকার। সকল মাতৃ ও আঞ্চলিক ভাষাকেই সমান মর্যাদা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। ‘৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারীতে শহীদ আত্মদানকারী সকলকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: সৈয়দ নাজমুল হুদা।
শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।