মুজিববর্ষে, বঙ্গমাতার অবদান


Published: 2020-02-03 01:40:15 BdST, Updated: 2020-04-11 00:37:14 BdST

সৈয়দ নাজমুল হুদাঃ বঙ্গমাতা ছিলেন স্বাধীন বাংলার প্রথম ফার্স্ট লেডি এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী। তাঁর ছিল না কোন অহংকার। তিনি ছিলেন ন্যায় ও আদর্শের প্রতীক। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৭ তম জন্ম বাষির্কী উপলক্ষে প্রধানন্ত্রী বলেন “আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

মহিয়সী এই নারী ছিলেন বাঙ্গালী জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহচর। জাতির পিতার সহধর্মিনী হিসেবে তিনি আমৃত্যু স্বামীর পাশে থেকে দেশ ও জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন”।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলন একজন ন্যায়,ধর্মপরায়ন, আদর্শবান ও সাদামনের মানুষ। অহংকার কিংবা রাগ যাকে কখনও ছুঁতে পারেনি। সাধারন বাঙ্গালী নারীর মত জীবন যাপন করতেন তিনি। সন্তান সংসার আর দেশ সেবায় তিনি নিবেদীত ছিলেন। পাশাপাশি মুক্তির মহানায়কের সকল কাজে যিনি সাহস আর প্রেরণা যুগিয়েছেন।

১৯৩০ সালের ৮ আগষ্ট শেখ জহিরুল হকের ঘরে আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করেন আজকের বঙ্গমাতা। জন্মের পর ফুলের মত নিষ্পাপ আর সৌন্দর্য্য হওয়ায় নাম রাখা হয়েছিল রেণু। জন্মের তিন বছর পর পিতা হারা হন বঙ্গমাতা। দুই বছর পর অর্থাৎ রেণুর বয়স যখন পাঁচ তখন মাতৃ হারা হন বঙ্গমাতা। তার দুই বছর পর পরম আপনজন দাদা শেখ আবুল কাসেম ইহলোক ত্যাগ করেন।

এমতবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের গর্ভধারিণী শেখ সায়েরা খাতুন রেণুকে তার কাছে নিয়ে আসেন। এ কারণে সায়েরা খাতুনকে বলা হয় বঙ্গমাতার শুধু শাশুড়ি নয় তিনি ছিলেন মাও বটে। ১৯৩৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও রেণুর আনুষ্ঠানিক ভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়। পুত্র বধুকে পরম আদরে, ভালোবাসা, সোহাগ আর মমতার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন।

শাশুড়ির স্নেহের আঁচলের নিচে তিনি শান্তির ছায়া খুঁজে নিয়েছিলেন। পিতৃ-মাতৃ হারা কন্যাটির আপন মানুষ বলতে এই পরিবার ছাড়া অন্য কেউ যে হতে পারে না তা বুঝার ক্ষমতা ও জ্ঞান বিধাতা দিয়েছিলেন বঙ্গমাতাকে। এ কারণে বঙ্গমাতা পরিবারের সকল সদস্যদের মুখে হাঁসি ফুটাবার জন্য নিজের স্বাদ, ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া কে বিসর্জন দিয়েছিলেন।

এত অল্প বয়সে বিবাহ হলেও তিনি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য অবেহেলা করেননি। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে শক্তি, সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। ইতিহাসের পাতায় বঙ্গমাতার ত্যাগ চির অম্লান হয়ে রয়েছে। সকল আন্দোলন ও সংগ্রামে বঙাগমাতার ছিলো আপোষহীণ ভূমিকা। বঙ্গমাতার দৃঢ়তা সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- “মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি, তা ছিল কল্পনাতীত।

স্বামীকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণঙ্গণে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দি। যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আম্মা মনোবল হারায়নি”। বঙ্গমাতা ত্যাগের অন্য এক দৃষ্টান্ত- বঙ্গবন্ধু জেলে, সংসার ও সংগঠনের জন্য টাকার প্রয়োজন। এমতাবস্থায় তিনি টাকার জন্য বাড়ির ফ্রিজটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

এ সম্পর্কে বঙ্গমাতা বলেছেন- “ঠান্ডা পানি খাওয়া ভালো নয়। শরীর খারাপ হতে পারে। কাজেই এর আর দরকার নাই”। অকৃত্রিম ভালোবাসার নজির পাওয়া যায় এভাবে। বঙ্গবন্ধু কে একবার এক নাগাড়ে ১৭ থেকে ১৮ মাস মিথ্যা মামলা আর হয়রানি করে জেলে রাখা হয়। জেল থেকে বের হয়ে আসলে বঙ্গবন্ধুর শরীর ও স্বাস্থ্য বেশ খারাপ দেখাচ্ছিল।

বঙ্গমাতা স্বামীকে বললেন “জেলে থাকো আপত্তি নেই। তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নেয়। ছোট বেলায় বাপ-মা মারা গেছেন তোমার কিছু হলে বাঁচবো কি করে”? প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে যখন বঙ্গবন্ধু জেলখানায় যেত তখন জেলে সাক্ষাত করে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতেন এনে দলকে।

বঙ্গমাতা ছিলেন দলের একজন নিরব সংক্রিয় কর্মী। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা কিংবা মৃত্যুর ষড়যন্ত্র কোন কিছুতেই বঙ্গবন্ধু ভয় পাননি। কারণ তাঁর যেমন ছিল মনোবল তেমনি ছিল বঙ্গমাতার মত একজন সাহসী ত্যাগী স্ত্রী। এজন্য বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “আমার জীবনে দুইটি অবলম্বন আছে। একটি আমার আত্মবিশ্বাস ও অপরটি আমার স্ত্রী। বঙ্গমাতা প্রিয় স্বামীর পছন্দের খাবার নিজ হাতে রান্না করে অফিসে পাঠাতেন।

কোন কোন দিন নিজেই নিয়ে যেতেন সেই খাবার। '৫২ এর ভাষা আন্দোলন, '৫৮ এর মিথ্যামামলা দায়ের, '৬৬এর ছয় দফা, '৭০ এর নির্বাচনে জয় লাভ, '৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ সকল ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে সাহস ও শক্তির বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছেন এই মহিয়সী নারী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন- “আমি আশা করি, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনী চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন, বাঙ্গালির স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধনিতা সংগ্রামের অনেক অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারবে”।

১৭ মার্চ ২০২০ হতে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। মুজববর্ষের ক্ষণ গণনা ও জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের অগণীত মানুষ বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। মুজিববর্ষ যেমন ইতিহাসের পাতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। তেমনি বঙ্গমাতা ও বঙ্গবন্ধু প্রতিটি বাঙ্গালীর প্রাণের স্পন্দন। মুজিববর্ষ হোক বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কর্মময়।

লেখকঃ সৈয়দ নাজমুল হুদা,
শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

ঢাকা, ০২ ফেব্রুয়ারী (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।