ধর্ষকদের অভয়ারণ্য এখন বাংলাদেশ!


Published: 2020-01-19 19:37:20 BdST, Updated: 2020-04-11 00:26:50 BdST

মনিরুজ্জামান মাজেদ, ঢাবিঃ ঢাকার একটি দেওয়াল লিখন দৃষ্টি আকর্ষণ করল, ‘সময়টা এখন আমাদের’। শ্লোগানটা অনেক সুন্দর। কিন্তু কেন যেন মনে হল, ‘সময়টা এখন আমাদের’ স্থলে ‘সময়টা এখন ধর্ষকদের’ লেখা থাকলেই যথোপযুক্ত হত।

সময়টা এখন ধর্ষকদের, বাংলাদেশ এখন ধর্ষকদের অভয়ারণ্য। এ দেশে ধর্ষণের মহোৎসব চলছে। শিশু থেকে শুরু করে কিশোরী, যুবতী, মধ্যবয়সী– সবাই শিকার হচ্ছেন ধর্ষণের। অভিজাত হোটেল থেকে বস্তি এলাকা- ধর্ষকদের অভয়ারণ্য যেন সবই।

প্রতিদিন সকালে সংবাদপত্র কিংবা টিভি খুলে বসলেই সবচেয়ে বেশি যে নিউজটা পাওয়া যায় সেটিই ধর্ষণ ঘটনা। এই ধর্ষণ যেন নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশে ধর্ষন একের পর এক ঘটেই চলেছে। কেন থামছে না এই ধর্ষণ? এর সুস্পষ্ট কারণ কি আমরা জানি?

চলুন দেখে আসা যাক গত কয়েক বছরে ধর্ষণের অবস্থা কি ছিল বাংলাদেশে। গত দশ বছরের ধর্ষণের চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১০ সালে সারা দেশে ৫৯৩ জন, ২০১১ সালে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য সংরক্ষণ ইউনিট জানাচ্ছে, ২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ৭০৭টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৩৮৭টি, গণধর্ষণ ২০৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১৩ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৮১টি। ২০১৫ সালে মোট ধর্ষণ ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৮৪টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৯৪টি।

২০১৬ সালে মোট ধর্ষণ ৭২৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪৪টি, গণধর্ষণ ১৯৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৩৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৮ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৬৫টি। ২০১৭ সালে মোট ধর্ষণ ৮১৮টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫৯০টি, গণধর্ষণ ২০৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৪৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১১ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৪টি।

২০১৮ সালে মোট ধর্ষণ ৭৩২টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫০২টি, গণধর্ষণ ২০৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৩, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৭ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৩টি। আর ২০১৯ সালের ১৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

এই ধর্ষণের শেষ কোথায়? গত ১০ বছর আগের থেকে বর্তমান ধর্ষণের সংখ্যা দ্বিগুনের চেয়ে ও বেশি। কেন এই ধর্ষন বাড়ছে?

এইসব ধর্ষকদের বেশিরভাগ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। পরবর্তীতে ভিক্টিমরা নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে ও সামাজিক চাপে আর মামলা করতে যায় না। কারণ মামলা করে উল্টা নিজেদের হয়রানির স্বীকার হতে হয়।

এই পর্যন্ত যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়াতে ভালোভাবে প্রচার হয়েছে সেগুলোর বিচারের জন্য প্রশাসন তৎপরতা দেখিয়েছে। সেগুলোর আসামীরা ও কিছুদিন পর মুক্তি পেয়ে গেছে।

এক তথ্য মতে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সমাজবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক প্রফেসর ড. সাদেকা হালিম এই ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন "বিশেষ করে ইনফরমাল সেক্টরে নারীদের সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে পারছি না, সম্মান বাঁচানোর জন্য কাওকে না বলা বা বিচারের আশ্রয় গ্রহণ না করা, তারপর যারা বিচার চাচ্ছে তাদের বিচার ও বিলম্বিত হচ্ছে, আর বিচার যাদের হচ্ছে তারা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে"

তিনি আরও বলেন "জাতির পিতাকে হত্যার পর আমাদের স্কুল কলেজের কারিকুলাম বদলে গেছে যার ফলে আমাদের মূল্যবোধ তৈরীর জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। আর আমরা নারীদের গুন গুলোকে হাইলাইট না করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে দেখি"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম ধর্ষণ সম্পর্কে ক্যাম্পাসলাইভকে জানান "সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম সঠিকভাবে পালন করছে না এর মাঝে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতা অন্যতম কারণ"

ধর্ষণ থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি আরও কয়েকটি বিষয়ের কথা বলেন:
১.ধর্ষনের মামলা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে।
২.বিচারহীনতা সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। ভিক্টিমরা আসলে বিচার পাবে কিনা এইজন্য তারা মামলা করতে ভয় পায়। এই বিচারহীনতা সংস্কৃতি দূর করতে হবে।
৩.পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। এই মনোভাব তৈরি করতে হবে যে নারী পুরুষ সমান। এছাড়া পরস্পরকে সম্মান করার মনোভাব ও তৈরি করতে হবে।

৪.সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক মতো কাজ করতে হবে। শক্তিশালী সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে সামাজিক, নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্ষণ এর বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।
৫. উন্নয়নের পাশাপাশি সকল জায়গায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বশেষ তিনি বলেন সবাইকে নিয়ে বহুমুখী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করেই এই ধর্ষণকে প্রতিরোধ করতে হবে।

ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।