বঙ্গমাতা ছিল বঙ্গবন্ধুর শক্তি, সাহস ও প্রেরণার উৎস


Published: 2019-12-22 21:33:17 BdST, Updated: 2020-04-04 09:19:30 BdST

সৈয়দ নাজমুল হুদাঃ জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান, মাতা ভগ্নী ও বধুদের ত্যাগে হইয়াছে মহিয়ান। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে যে মহীয়সী নারীর ত্যাগ ও সংগ্রাম জড়িয়ে আছে তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে বাস্তবায়ন করার জন্য ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেছেন বঙ্গমাতা।

বেগম মুজিব ছিলেন একজন আদর্শ নারী, স্বার্থক মাতা। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ উপদেষ্টা, পরামর্শদানকারী, একটি স্মরনীয় নাম, একটি ইতিহাস ও সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর শক্তি ও প্রেরনার উৎস। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন কোমলে কঠোরে মিশ্রিত একটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন প্রতিভাবান নারী।

অসীম সাহস, ধৈর্য ও বিচক্ষনতার সাথে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কখনো কার্পন্য করেননি বেগম মুজিব। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার এবং গাইড। বঙ্গবন্ধু বলতেন আমার জীবনে ২ টি অবলম্বন আছে একটি আমার আত্মবিশ্বাস. অপরটি আমার স্ত্রী।

বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে জেলে থাকা অবস্থায় একটি চিঠিতে লিখেছিলেন সেই চিঠির কিছু অংশ বিশেষ “আপনি আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন, দেশের কাজই আপনার সব চাইতে বড় কাজ, আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান, আমার জন্য চিন্তা করবেন না”।

১৯৬৬ এর ৬ দফা দাবীকে কেউ কেউ ছয় দফা না আট দফা তা নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন। এক্ষেত্রে বঙ্গমাতা ঐতাহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গমাতা বললেন ছয় দফা থেকে আমাদের এক পাও পিছু হটা যাবে না। যে কোন মূল্যে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ছয় দফা বাস্তবায়িত করতে হবে। বঙ্গমাতা ছয় দফার সমর্থনে বোরকা পরে জনসংযোগ করতেন।

যে ছয় দফা পরবর্তীতে বঙ্গালী জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে প্রমাণীত হয়েছে। ৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করতেন, মামলায় প্রতিটি বন্দি পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নেওয়া ও নিঃশর্ত মুক্তির সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মত অঢল থেকে সংগ্রাম করে সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন এই মহীয়সী নারী।

দেশপ্রেমের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তির্ণ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, চেতনা, আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে শক্তি, সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুর কারাগারে থাকাকালীন সময়ে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে সংকট দেখা দিলে বঙ্গমাতা পর্দার অন্তরালে থেকে দৃঢ়, কৌশলী এবং বলিষ্ঠ ভ’মিকার মাধ্যমে সংগঠনের জন্য কাজ করতেন।

বঙ্গমাতা ভালবাসতেন দেশকে। দেশের মানুষের কল্যানে, নিজেকে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে উৎসর্গ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেম থেকে সমাজ সংস্কারের জন্য ছিল তার অদম্য আগ্রহ। এজন্য তিনি একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর এই সংগ্রামের পথপ্রদর্শক হিসেবে নিরবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে কাজ করেছেন বঙ্গমাতা।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ভাষনে বঙ্গবন্ধুর প্রধাণ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছেন বঙ্গমাতা। সেই ঐতিহাসিক ভাষনের মূহুর্তে বঙ্গমাতার কি ভ’মিকা ছিল? বঙ্গমাতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ মূলক বক্তব্যে মিলেছে সে সন্ধান- জনসভায় যাওয়ার কিছুক্ষন পূর্বে আব্বা কাপড় পড়ে তৈরি হবেন। মা আব্বাকে নিয়ে ঘরে এলেন।

দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আব্বাকে বললেন ১৫ মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকার জন্য। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে মাথা টিপে দিচ্ছিলাম। মা বেতের মোড়াটা টেনে আব্বার কাছে বসলেন। যে কোন বড় সভায় বা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার আগে আমার মা আব্বাকে কিছুক্ষন একদম নিরিবিলি রাখতেন।

মা আব্বাকে বললেন, সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তোমার মনে যে কথা আসে তুমি তাই বলবে। অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার উপর সামনের অগণিত মানুষের ভাগ্য জড়িত। বঙ্গমাতার পরামর্শ, সাহস ও প্রেরনা থেকেই বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক সেই ভাষণ আজ ইউনোস্কো কর্তৃক স্বীকৃত লাভ করেছে। এনেছে স্বাধীনতা ছিনিয়ে। পূরণ করেছে ৭ কোটি মানুষের আশা আকাঙ্খাকে।

টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে মুজিব,মুজিব থেকে মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙ্গালী জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যার অবদান অনস্বীকার্য, ইতিহাসের পাতায় চলমান, তিনি আর কেউনন তিনি হচ্ছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জাতির পিতার জীবনে যেমন বাংলাদেশে ও স্বাধীনতা শব্দটি মিশে আছে। তেমনি বঙ্গবন্ধুর জীবনে বঙ্গমাতা আলোকবর্তিতা ও অবিস্মরনীয় হয়ে রয়েছেন।

ইতিহাসের পাতায় এই মহীয়সী নারীর অবদান জাতি কৃতঙ্গ ভরে স্মরন করবে। নারীর অবদান, গুরুত্ব ও ক্ষমতায়নে নানা জাতির পথিকৃৎ হয়ে রবে তোমার কর্মযজ্ঞ। দেশ প্রেমে উদ্ভত্ব করবে প্রতিটি নারীকে। বাংলার প্রতিটি মানুষের মনের মনি কোঠায় স্মরণীয় হয়ে রবে তোমার কর্মময়।

পরাধীনতার যন্ত্রনা ও গ্লানি এবং বেকারত্বের হতাশা ও অসন্তোষ থেকে মুক্তির সংগ্রামে অন্যতম পথপদর্শক ছিলেন বঙ্গমাতা। শাসক গোষ্টির অন্যয়ের সাথে বঙ্গবন্ধুকে কখনও আপোষ করতে দেননি এই মহীয়সী নারী। এ দেশের জনগণের শতকরা আশি ভাগ কৃষক ও কৃষি নির্ভর ছিল।

বঙ্গবন্ধু কৃষকের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। স্বার্থ বা অন্যায়ের সাথে আপোষের ক্ষেত্রে বঙ্গমাতার একটি ঘটনা উল্লেখ করি ১৯৭১ সালের ২৩ বা ২৪ তারিখ হবে মার্চ রাতে আওয়ামীলীগের সাথে পিপিপি’র সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনকরার প্রস্তাব আসে বঙ্গবন্ধুর কাছে।

এই প্রস্তাব আসার সাথে সাথে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন- “দেখো আমি তোমার রাজনীতি করি না, তুমি যদি ভুট্টোর সাথে কোয়ালিশন করো তবে লোক এই বাড়িতে পাথর মারবে। আমি এ বাড়ি থাকবো না, টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে চলে যাব”।

এমন দৃঢ়চেতা মনোভাব ও সাহসী ভুমিকার কারণে বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যদি সে সময়ে কোয়ালিশন করতেন তবে আমরা কি স্বাধীনতা ও স্বাধীন দেশ পেতাম। এটা সম্ভাব হয়েছিল বঙ্গমাতার দৃঢ়চেতা মনোভাব ও ব্যতিক্রমী ভুমিকার কারণে। বাংলা ও বাঙ্গালী জাতির মুক্তির আলোর দিশারী ছিলেন বঙ্গমাতা।

মুক্তিকামী মানুষের কল্যানে চিন্তায় নিজের পরিবারের কথা না ভেবে বঙ্গবন্ধুকে যুগিয়েছেন সাহস ও প্রেরনা। আজ স্বাধীন বাংলায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ে। আমরা মুক্ত কন্ঠে আমার সোনার বাংলা গান গাই। আমরা পাকিস্থান সহ সকল অপশক্তির নাগ পাশথেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পেরেছি। এই স্বপ্ন যে দেখেছিল তিনি আমাদের মাঝে নেই। নেই তার অনেক পরম আপন জনেরা। বঙ্গমাতা সহ সকল শহীদদের প্রতি বিজয়ের এই মাসে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক:
সৈয়দ নাজমুল হুদা,
প্রভাষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

ঢাকা, ২২ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।