ভালো থাকুক খুবি


Published: 2019-11-26 13:22:58 BdST, Updated: 2019-12-06 06:36:50 BdST

খুবি লাইভঃ বেগুনি জারুল ফুলের চাদর, লাল কৃষ্ণচূড়ার শামিয়ানা, বর্ষায় ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে থোকায় থোকায় কদমফুল, শরতের শুভ্র কাশফুলের আবরণে বেষ্টিত আর ছোট একখণ্ড সুন্দর বন বলে পরিচিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৃতির সব রূপ-রঙের বদল এখানে চোখে পড়বেই।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিন বঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ এবং দেশের একমাত্র ছাত্ররাজনীতি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি গেজেটে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯১ সালের ২৫ নভেম্বর ৪টি পাঠ্য বিষয়ের ৮০ জনশিক্ষার্থী নিয়ে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ টি স্কুল ও ২ টিইন্সিটিউট এর অধীনে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার জন এবং প্রতি বছর ২৯ টি পাঠ্য বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়।

দীর্ঘ ২৮ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে খুবি ক্যাম্পাসের। প্রকৃতির আদলে ১০৬ একরের প্রতিটা জায়গাই যেন মায়াময়। প্রতিদিন শহর থেকে হাজারো তরুণ প্রাণ ক্যাম্পাসে পদার্পণ করে। ক্লাসের ফাকে ফাকে গান-আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে ক্যাফেটেরিয়া, অদম্য বাংলা, তপন দাদার চায়ের দোকান আর লাইফ সায়েন্সের মাঠ। গিটারের টুংটাং আর গানের সুরের সাথে সাথে মৃদু বাতাসে নাচতে থাকে লম্বা সবুজ ঘাসগুলো।

তপন দাদার দোকানের ডাল পুরি আর এক কাপ চা ছাড়া যেন সেই দিনের আমেজই আসেনা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে বিভিন্ন আলোচনা। আড্ডায় মেতে উঠে হাসতে হাসতে অজান্তেই একজনের গায়ের উপরে লুটিয়ে পড়ে অন্যজন। প্রতিটা গ্রুপেই একজন করে অতিপ্রিয় বন্ধু থাকে যাকে কারনে অকারণে দল বেধে পচানো হয়। কখনো কখনো চায়ের শেষ চুমুকটা বিরক্তির কারণও হয়, কেননা এবারতো ক্লাসে যেতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে কিছুটা এগিয়ে আসলেই চোখে পড়ে অদম্য বাংলা। স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে এই ভিত্তিস্তম্ভ। যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মনে করিয়ে দেয়। ১৫ ই আগস্ট, ১৬ ই ডিসেম্বর, ২৬ শে মার্চে অদম্য বাংলাতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়।

এছাড়াও মুক্ত মঞ্চ, শহীদ মিনার বর্ধন করেছে খুবির সৌন্দর্য আর প্রকাশ করেছে স্বাধীনতা প্রেমি মনোভাব। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো মুক্ত মঞ্চেই হয়ে থাকে। সকালের ব্যস্ততার একটা ছাপ ক্যাফেটেরিয়ায় দেখা যায়। মামার দুইটা সিংগাড়া, খিচুরি আর ডিমভাজি, অর্জুনচা, আদাচা, তুলসীচা, কফি, চপ, সামুচার চাহিদা মনে করিয়ে দেয় ক্লাসে যাওয়ার কথা। সকালের পর কিছুটা সময় ক্যাফে থাকে নিস্তব্ধ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছাড়া নিষ্প্রাণ মনে হয় ক্যাফে।

আবার দুপুর হতেই শুরু হয় ক্যাফের প্রাণ সঞ্চালন। বিকালে বিভিন্ন সংগঠনের মিটিং, আড্ডা, হৈ-হুল্লোড়, গিটারের টুংটাং শব্দে মুখরিত থাকে ক্যাফে। জানা অজানা অসংখ্য গানের লাইনের সাথে টিকটিক করে বয়ে চলে ঘড়ির কাটা, কখন যে রাত ১০ টা বেজে যায় কারোরই মনে থাকেনা।

ক্যাফের প্রতিটি দেওয়ালে রয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীদের আবেগ মিশানো আঁকিবুঁকি, এই আঁকিবুঁকির ছোয়া থেকে বাদ পড়েনি বাইরের খাম্বা গুলোও। খুবিতে রয়েছে তিনটি একাডেমিক ভবন। একাডেমিক ভবনগুলো যেন এক একটা বিচিত্র ক্ষেত্র। চেনা অচেনা শতমুখ, তার সাথে নিজেদের বয়সী সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত স্যার ম্যাম দের কে মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলতে হয় সিনিয়র ভাইয়া আপুদের সাথে।

প্রতিদিন হাজারো স্বপ্নের জন্ম দেয় একাডেমিক ভবনগুলো, আর প্রতিটি শিক্ষকই যেন এক একজন অনুপ্রেরণা। ৩ নং (কবিজীবনানন্দ দাস) একাডেমিক ভবনের কথাব লতে গেলে শ্রদ্ধেয় শাহ নেওয়াজ নাজিমুদ্দিন স্যারের কথা বলতেই হবে। একজন মানুষ যে বিশ্ববিদ্যায়কে কতটা ভালোবাসতে পারেন সেটা স্যারকে না দেখলে বোঝা যাবেনা। ক্লাসরুম, টিচার্স কোরিডোর, অফিস রুম আর টি-রুমে ঘটে চলে বোঝা না বোঝা হাজারো খুনসুটি।

সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, চারুকলা আর ভাষ্কর্য ডিসিপ্লিনের কোরিডর সবসময় মুখরিত থাকে শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়ায়। একাডেমিক প্রেশার একটু বেশি হওয়াতে প্রতিদিনই লাইব্রেরীতে গিয়ে অধ্যায়ন করে শিক্ষার্থীরা। ভাষ্কর্য ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের নিজেদের হাতে বানানো বিভিন্ন শৈলী নজর কাড়ে হামেশা। রাতগভীর হওয়ার সাথে সাথে কাঠের গায়ে হাতুড়ি, বাটাইলের ঠুকঠাক শব্দ স্পষ্টহতে থাকে।

নিত্য-নতুন উৎসব-অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাস সবসময় মুখরিত থাকেই। তবু এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব শিক্ষা সমাপনী আর পহেলা বৈশাখ। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানুষের এত ভিড় হয় যে এত বড় ক্যাম্পাসেও হাঁটার তিল পরিমাণ জায়গা খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। সেন্ট্রাল মাঠের চার পাশ দিয়ে থাকে ছোট বড় অনেক স্টল।

জুনিয়র বিক্রেতা আর সিনিয়র ক্রেতা, সিনিয়র-জুনিয়রের এমন রোমাঞ্চকর সম্পর্ক শুধু খুবিতেই দেখা যায়। নাগরদোলা, পুতুলনাচ, সাপ খেলা, মোরগ লড়াইয়ের মত ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরা হয় এই দিনে৷। পহেলা বৈশাখের মত শিক্ষা সমাপনীতে ও হয় তিন দিনব্যাপি অনুষ্ঠান। কালার ফেস্ট, ট্রাকর‌্যালি, নামি ব্যান্ডের কন্সার্টে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ খুলনা নগরীও মেতে ওঠে ওই দিনগুলোতে।

এছড়াও পিঠাউৎসব, বসন্তবরণ, চৈত্র সংক্রান্তি, শিক্ষামেলা জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো বিশেষ জমকালো আয়োজনে পালিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্য রয়েছে হলের সুব্যবস্থা। দুইটি ছাত্রী হল এবং তিনটি ছাত্র হলে নিরাপদে থাকে ছাত্র-ছাত্রীরা।

এই জায়গায় যেন সব চিন্তাগুলো নিশ্চিন্তে যাপন করে। সেন্ট্রালমাঠ, মসজিদ, মন্দির, গবেষণাগার, জীমনেশিয়াম, মেডিকেল, টিচার্স ক্লাব কিছুরই যেন অভাব নেই এখানে। অরাজনৈতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় নেই কোন হানাহানি, নেই ক্লাস বন্ধ হওয়ার চিন্তা, নেই সেশন জটের ভয়, নেই জীবনের ঝুঁকি।

যারা প্রকৃতি ভালোবাসে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চায়, প্রতিমুহূর্তে প্রকৃতির রূপ তারা আস্বাদন করতে পারবে এখানেই। সেটা হোক শুভ্র কাশফুলের ওপর হাত ছোঁয়ানো মুহূর্ত, হোক অনিকেত প্রান্তরে সবুজ মাঠে হাজারো পাখির কিচিরমিচির শব্দের মাঝে বসে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা পিচ ঢালা রাস্তায় বৃষ্টির পর ঝরে পড়া সবুজ পাতা আর লাল কৃষ্ণচূড়ার
আবেগী রূপ দেখা।

খুবি মানে শিক্ষার্থীদের ৯ টা থেকে ৫ টাপর্যন্ত ক্লাস। খুবি মানে লাইব্রেরিতে বসে পড়া, ভবিষ্যতের জল্পনা কল্পনা আকা। খুবি মানে নীল আর হলুদ রঙের বাস। খুবি মানে ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহল, গোল হয়ে গাছতলায় বসে আড্ডা দেওয়া, তপন, সাইদূল, হুমায়ুনের সে চাখাওয়া, বন্ধুর খাবারে ভাগ বসানো আর তুচ্ছ বিষয়ে গলা ফাটিয়ে ঝগড়ার দৃশ্য।

প্রাণের ক্যাম্পাসের প্রতিটি দিনই জীবনের ক্যানভাসে আকা থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে যখন ক্যাম্পাসে আসব, নিশ্চয়ই এই চির চেনা জায়গা গুলো অনেক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেবে। ভালো থাকুক খুবি।

ঢাকা, ২৬ নভেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।