হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমিক যুগলকে যেভাবে হত্যা করা হয়


Published: 2017-10-28 13:28:52 BdST, Updated: 2017-11-18 12:12:15 BdST

লাইভ প্রতিবেদেক : রাজশাহীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অন্যজন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে জানা গেছে। এদের একজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ও অন্যজনকে ধর্ষণের পর বালিশচপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এনিয়ে গত একবছর ধরে নানা তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা ‘ক্লুলেস’ ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত চারজনকেই গ্রেফতার করেছে।

পিবিআই জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় আহসান হাবিব ওরফে রনি (২০), রাজশাহী কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র বোরহান কবীর ওরফে উৎস (২২), তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আল-আমিন (২০) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত মাহমুদ (২১)।

এদের মধ্যে রনি ও উৎস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর দুজন পিবিআইয়ের কাছে ঘটনা স্বীকার করলেও আদালতে গিয়ে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, গত বছরের ২২ এপ্রিল রাজশাহীর হোটেল নাইসের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিজানুর রহমান ও তার প্রেমিকা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মিজানুরের লাশ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো ছিল। আর সুমাইয়ার লাশ ছিল বিছানায়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিলো।

পিবিআই জানায়, ওই হত্যাকান্ডটি পুলিশ তদন্ত করছিলো। পরে পুলিশ এর ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। ডিএনএ রিপোর্টও অজ্ঞাত কারণে শুধু নিহত মিজানের ডিএনএ পাওয়া যায়। অন্য কারো ডিএনএ সেখানে পাওয়া যায়নি। একেবারেই ক্লু-লেস এই মামলাটি পিবিআই না পাওয়ায় ছায়া তদন্ত করছিলো।

মূলত তিনটি আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো, হোটেলের কক্ষে তিন ধরনের সিগারেটের মোথা। একজন মানুষ কখনোই তিন ধরণের সিগারেট খায় না। তাছাড়া মেয়েটির শরীরে কামড়ের দাগ ছিলো। কোন প্রেমিক তার প্রেমিকের সঙ্গে বন্ধ ঘরে কামড়াবেনা। তৃতীয় ছিলো, নিহত মিজানের প্যান্ট খোলা ছিলো। পরে তা উল্টো করে পড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। এই তিনটি কারণকে সামনে রেখেই পিবিআই তদন্ত শুরু করে।

কিন্তু কোন ক্লু না থাকায় পিবিআই এগুতে পারছিল না। মিজানের ফোন কল লিস্ট দেখে সেখানে রনির নাম্বারে কল করার আলামত পাওয়া যায়। পিবিআই রনিকে দীর্ঘদিন ধরেই অনুসরন করছিল। পরে পিবিআই কর্মকর্তারা ১৮ অক্টোবর আহসান হাবিব রনিকে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন রাজশাহীর দুটি ছাত্রাবাস থেকে অপর তিনজনকে গ্রেফতার করে।

রনি পিবিআইকে জানায়, তার সঙ্গে মিজানের আগে থেকেই পরিচয় ছিলো। তার মাধ্যমেই মিজান হোটেলের কক্ষে উঠে। তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং আদলতে স্বীকারোক্তি দেয়।

রনি জানায়, ২০১৪ সালে তার সঙ্গে মিজানের পরিচয় হয়। সে সময় রনি উল্লাপাড়ায় মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে একটি মেসে ওঠে। তার পাশের আরেকটি মেসে থেকে তখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করতেন মিজান। নিজের মেসের খাবার ভালো না হওয়ায় রনি তখন মিজানের মেসে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন। তখন থেকেই তাদের পরিচয়। পরে মিজান ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে থাকেন রনি। মিজানের সঙ্গে আবার তার যোগাযোগ হয়। রাজশাহীর রিলাক্স মেসে থাকতে গিয়ে রাহাতের সঙ্গে রনির পরিচয় হয়। এখানকার নঁকশি ছাত্রাবাসের উৎস ও আল-আমিন ছিলেন রাহাতের পূর্ব পরিচিত।

এদের মধ্যে পাবনার ফরিদপুর উপজেলার জন্তিহার গ্রামে রনির বাড়ি, রাহাতের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়, আল আমিনের বাড়ি রাজশাহীর পবায় এবং বোরহানের বাড়ি নাটোরের লালপুরে।

রনি পিবিআইকে জানিয়েছে, সুমাইয়ার সঙ্গে রনির পরিচয় ছিল। তার কাছ থেকে মুঠোফোন নম্বর নিয়ে কথা বলা শুরু করেন রাহাত। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়। প্রায় ছয় মাস তা টিকে ছিলো।

আহসান হাবিব রনি পিবিআইকে আরো জানান, হত্যার তিন দিন আগে রাহাতের ছাত্রাবাস নগরীর বিনোদপুরের বায়তুল আমানে যান। সেখানে আল আমিন ও উৎস ছিলো। চারজন মিলে তারা তাস খেলার ফাঁকে রাহাত জানান, সুমাইয়া তার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে মিজানের সঙ্গে প্রেম করছে। রনি তখন রাহাতকে জানান, যে মিজান তার পূর্বপরিচিত। রাহাত তখন দুজনকে হাতেনাতে ধরার জন্য অপর তিনজনের সাহযোগিতা চান।

হত্যার আগেরদিন রনিকে ফোন দেন মিজান। তার ভাই ও ভাবি রাজশাহী আসছেন বলে জানান। তাদের থাকার জন্য ভালো আবাসিক হোটেলের সন্ধান চাইলে রনি হোটেল নাইসে উঠার পরামর্শ দেন। এরপর রনি জানতে পারেন, ভাই-ভাবি না, সুমাইয়াকে নিয়ে সে হোটেলে উঠেছে। তখন বিষয়টি রাহাতকে জানায় রনি।

ঘটনার দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মিজান ও সুমাইয়াকে তারা চারজন দেখতে পান। পরে তারা তাদের অনুসরণ করেন। সুমাইয়াকে নিয়ে মিজান হোটেল নাইসের সামনে থামেন।

ছবি : সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া প্রেমিক যুগল হোটেল বুক করছে

হত্যার দিন রাত পৌনে আটটার দিকে এক হোটেল বয়কে ম্যানেজ করে রাহাত ও রনি। তার দেখানো পথেই তারা চারজন হোটেল নাইসের পাশের একটি মার্কেটের তিন তলার ছাদে উঠেন। সেখান থেকে হোটেল বয়ের সাহায্য নিয়ে তারা ৩০৩ নম্বর কক্ষের এসি মেরামতের পকেট দরজা দিয়ে ঢোকেন। ওই সময় সুমাইয়া কক্ষে একা ছিলেন। পরে সেখানে সুমাইয়ার সঙ্গে রাহাত ও রনির ঝগড়া হয়। তবে হোটেলের কক্ষের টিভিতে তিব্র আওয়াজে মাস্তি টিভিতে গান চলতে থাকায় ঝগড়ার শব্দ বাইরে যায়নি। তারই সুমাইয়াকে বাধ্য করে মিজানকে ডেকে আনার জন্য। পরে ফোন করে সুমাইয়া মিজানকে আসতে বলে। এসময় মিজান এলে তাকে চারজন মিলে চড় থাপ্পড় মারতে থাকে।

যেভাবে হত্যাকান্ড ও ধর্ষণ করা হয় :
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামী রনি ও উৎসের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে জানান, মিজানকে চড় থাপ্পড় মারতে থাকে সে মেঝেতে পড়ে যায়। তখন রনি মিজানের পা ধরে রাখে। সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে রাহাত ও আলামিন তাকে ফাঁস দেয়। এসময় সুমাইয়া তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে থাকলে তাকে ধরে রাখে উৎস। মিজান মারা গেলে তাকে মেঝেতে ফেলে রেখে রাহাত প্রথমে ধর্ষণ করে সুমাইয়াকে। পরে আল আমিন তাকে ধর্ষণ করতে গেলে সুমাইয়া বাঁধা দেয়। এসময় আল আমিন তাকে টেবিলের পায়া দিয়ে আঘাত করে। তার বাম চোখের উপরে জখম হতে রক্তপাত হতে থাকে। এসময় মেয়েটি ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়ে। এরপর রনি তাকে ধর্ষণ করে। শেষে উৎস তাকে ধর্ষণ করতে গিয়ে এক মিনিটের মধ্যে নেমে আসে।

উৎস পিবিআইকে জানায়, ধর্ষণের পর তারা সবাই মিলে মিজানকে সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। এরপর তারা সুমাইয়াকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। এরপর তারা আবার জানালা দিয়েই পাশের মার্কেটের ছাদ হয়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনার পর কাউকে কিছু না বলতে রাহাত পাঁচ হাজার টাকা দেন রনিকে। আর আল আমিনকে দশ হাজার টাকা দেন।

নিহত মিজানের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে মিজান সবার বড়। তার বাবা উমেদ আলী একজন কৃষক। সুমাইয়ার পরিবার থাকে বগুড়ায়। তিন বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া দ্বিতীয়। তারা বাবা আবদুল করিম পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই)। ঘটনার পর আব্দুল করিম বাদী হয়ে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআই এর উপপরিদর্শক (এসআই) মহিদুল ইসলাম বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের কোন ক্লু ছিলো না। আসামীরা সবাই ক্রাইম পেট্রোল দেখতো। সে অভিজ্ঞতায় তা বেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করে। পুলিশ তাদের ফাইনাল রিপোর্টে বলেছিল, সুমাইয়াকে মাথায় আঘাত করেছিলেন মিজান। এরপর বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে মিজান আত্মহত্যা করে। মিজানের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে তাকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। আর সুমাইয়াকে শ্বাসরোধ করে হত্যার আগে ধর্ষণের কথা বলা হয়। ডিএনএ টেস্টেও সুমাইয়ার শরীরে শুধুমাত্র মিজানের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তিনি বলেন, এসব রিপোর্ট কেনো পরিবর্তন করা হলো তা আরো তদন্তের বিষয়। পিবিআই কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করেছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে আসল তথ্য।


ঢাকা, ২৮ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।