সেন্টমার্টিন দ্বীপের ১০ হাজার লোকের শেষ ভরসা মেডিকেল সহকারি ও পাহাদারসেন্টমার্টিন দ্বীপবাসীর স্বাস্থ্য সেবায় বেহাল দশা


Published: 2020-09-20 16:04:28 BdST, Updated: 2020-10-25 16:04:13 BdST

মিজানুর রহমান, ভ্রাম্যমাণ প্রতিবেদকঃ সেন্টমার্টিন দ্বীপের ১০ হাজার বাসিন্দা ও হাজারো পর্যটকের ভরসা ডাক্তারের সহযোগী সৈকত হাসান এবং পাহারাদার রমজান আলী। দ্বীপের ৭টি ঔষুধের দোকানের কর্তারাও অনুমানের ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা করেন দ্বীপবাসীর। সেন্টমার্টিনে ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল থাকলেও এটি মূলত ব্যবহৃত হচ্ছে মাদকসেবীদের নিরাপদ স্হান ও গরু ছাগলের চারণভূমি হিসেবে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুর আহমদ ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে জানান, প্রতি বছর অনেকেই ডায়রিয়া, হার্ট অ্যাটাক ও গর্ভবতী মহিলা জরুরী চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ ২৫ কি.মি. উত্তাল সাগড় পাড়ি দিয়ে টেকনাফ হাসপাতালে যাওয়ার মাঝপথেই মৃত্যুবরণ করেন। প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছর ১০-১৫ জন মানুষ মারা যাচ্ছে দ্বীপে। অনেক সময় আগত পর্যটকেরাও জরুরী চিকিৎসা পায় না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংসদ, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আবেদন করেও সমাধান হয়নি।

তিনি আরো বলেন, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের টেকনাফ-কক্সবাজারে গিয়ে চিকিৎসা করার মত সামর্থ নেই। ফলে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে অনেকেই। এখানে দুইজন এমবিবিএস ডাক্তারের পোস্টিং আছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দ্বীপে কোন ডাক্তার থাকে না। পোস্টেড ডাক্তারেরা টেকনাফে থাকে এবং সেখানেই চেম্বার করে।

সেন্টমার্টিন ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল

 

ফাউন্ডেশন অফ দ্যা রাইজিং হিউম্যানিটির সভাপতি ও সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা আল জাবের হোসাইন সিদ্দিকী ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, পোস্টেড এমবিবিএস ডাক্তারেরা শুধু পর্যটন মৌসুমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন বা কোন ভিআইপি দ্বীপে ভ্রমণ করতে আসছে জানতে পারলেই, উনাদের আগে স্পীডবোট নিয়ে এসে ফুলের তোড়া নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে উপস্হিত হয়।

মহামারি করোনায়ও দ্বীপের অসহায় মানুষের কথা ভাবার মত সময় উনাদের হয় নি। তিনি সারা বছর চলাচলের উপযোগী সী ট্রাক-সী এম্বুলেন্স, হাসপাতালের জরুরি-গাইনি-সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে যন্ত্রপাতি স্হাপন ও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে মনিটরিং এর আবেদন জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় লোক ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, কয়েক সপ্তাহ আগে সমুদ্রে গোসল করতে গিয়ে নাসিম নামের একটি বালক পানিতে ডুবে মারা যায়। তাকে যখন সাগর থেকে উদ্ধার করা হয় তখন সে জীবিত ছিল। হয়তো প্রাথমিক চিকিৎসা পেলে সে ভালো হয়ে উঠতো। পল্লি চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব ও নিজেরা ঝুঁকি নিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। গত ঈদুল আযহার প্রথম দিন বিকেলে চৌকিদার রুবেল (২৬) বুকে ব্যথা অনুভব করলে মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট সৈকতকে খবর দেয়। তাদেরকে ফিরিয়ে দেয় এই বলে যে, তোমরা মা মেডিকেল হলের মোতালেবকে নিয়ে যাও।

সেন্টমার্টিন ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল

 

এরপর তারা মোতালবকে ডাকতে গেলো। মোতালেব মোবাইলে জানালো, সৈকতকে ডাকতে। নিরুপায় হয়ে বাড়িতে ফিরে দেখে, রুবেল পড়ে আছে - হুঁশ জ্ঞান নাই। তারা আতংকিত হয়ে ঘাটে নোঙ্গর করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজে নিয়ে যায়। জাহাজের চিকিৎসক রুবেলকে মৃত ঘোষণা করেন। এ রকম হাজার ঘটনা বলে শেষ করা যাবে না।

সেন্টমার্টিন হাসপাতালের সাব এ্যাসিসট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সিএমও) সৈকত হাসান ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, আমি আউটডোরে চিকিৎসা দিই। যতটুকু পারি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। ইমার্জেন্সি হলে টেকনাফে রেফার করে দিই।

সেন্টমার্টিন হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডাঃ আহনাফ চৌধুরী ক্যাম্পাস লাইভ২৪ কে বলেন, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাকে সেন্টমার্টিনে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর এপ্রিলে আমাকে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় কোভিড-১৯ আইসোলেশন ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সেন্টমার্টিন ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল

 

সেখানে ১৫ দিন দায়িত্ব পালনের পর টেকনাফের কোভিড-১৯ এর আইসোলেশন ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ এরপর থেকে আমি টেকনাফে কাজ করছি। তিনি আরো জানান, ডাঃ রোমেনা রসিদ, এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)কে মার্চে সেন্টমার্টিনে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ওনি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এমন অবস্থায় তাঁর লান্সে পানি জমে গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় এখনো চিকিৎসাধীন আছেন।

সেন্টমার্টিনে কেন ডাক্তার থাকতে চায় না জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে ডাক্তারগণ স্বাভাবিকভাবে বঞ্চিত হয়। একজন সরকারি এমবিবিএস ডাক্তার সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত সময়ে চেম্বার করে অতিরিক্ত টাকা আয় করতে পারে। কিন্তু সেন্টমার্টিনে এই সুবিধা নেই।

এই বিষয়ে ডাঃ আহনাফ আরো বলেন, দ্বীপে খাবার পানির কোন সুব্যবস্থা নেই। এখানে সোলার সিস্টেমে কোনমতে একটা বাল্ব আর একটি ফ্যান চালানো যায়। অন্য জায়গার মতো মেডিক্যাল অফিসারদের জন্য কোয়ার্টারের ব্যবস্থা করতে হবে, পানি, বিদ্যুৎ এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।

সেন্টমার্টিনে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হলে কী করতে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ডাঃ আহনাফ বলেন, এখানে কোন ল্যাব সুবিধা নাই। একজন রোগীকে টেস্ট করানোরও কোন ব্যবস্থা নেই। গর্ভবতী রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কোন সুযোগ নেই। সেখানে ল্যাব তৈরি করতে হবে এবং অন্তত চারজন চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে। যাতে চক্রাকারে চিকিৎসা সেবা দেওয়া যায়।

সেন্টমার্টিন ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল

 

সরে জমিনে দেখা গেছে, কেবল নামমাত্র ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এখন গরুর ছাগলের চারণভূমি, হেলায় নষ্ট হচ্ছে অর্ধ কোটি টাকার জেনারেটরসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম।

দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা কবির আহমেদ জানান, সেন্টমার্টিন হাসপাতাল থেকে কখনো ডাক্তারের সেবা পাই নাই। যতবার এসেছি আশাহত হয়েছি। সরকারের বিনামূল্যে দেয়া ঔষধ গুলো আমরা চোখেও দেখি না। সরকারি ঔষধ গুলো কোথায় যায় জিজ্ঞেস করে, তিনি আফসোস করতে থাকেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায় ২০০৮ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের পর তিনজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, দুজন ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান, দুজন ফার্মাসিস্ট, ছয়জন ওয়ার্ডবয়, চারজন এমএলএসএস, তিনজন আয়া, একজন পিয়ন, একজন স্টোরকিপার, চারজন ঝাড়ুদার নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় সবাই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এরপর শূন্য পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য; ২০০২ সালে সেন্টমার্টিনের পশ্চিমপাড়ায় ২ একর জমিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দোতলা ভবনে ১০ শয্যার একটি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। প্রশাসনিক ভবন ও চিকিৎসকের আবাসিক ডরমিটরি নির্মাণ শেষে ২০০৮ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয় নি।

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।