অন্যায্য, স্বৈরতান্ত্রিক, জবরদস্তিমূলক আচরণ ও কার্যক্রম মানবে কেন?হাটহাজারীতে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার!


Published: 2020-09-19 02:47:17 BdST, Updated: 2020-10-29 10:33:49 BdST

ড. মাহফুজ পারভেজ: সমুদ্রঘেঁষা চট্টগ্রাম-হাটহাজারীর ছাত্র আন্দোলনের উতুঙ্গ ঢেউ প্রলয়ঙ্করী প্লাবনের সমতুল্য। গোঁড়া, রক্ষণশীল, অর্থডক্স ইসলামের মূলকেন্দ্র কাঁপিয়ে বিক্ষোভের এমন তরঙ্গ অকল্পনীয়। বাংলাদেশের মাদ্রাসা অঙ্গন পেরিয়ে ঘটনাটি সমগ্র দেশের নজর কেড়েছে। ‘আল্লামা শফি গ্রুপের বিরুদ্ধে আল্লামা বাবুনগরী গ্রুপের ক্যু’ বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও চরিত্রের দিক থেকে বিক্ষোভটি যে ‘শিক্ষা বিষয়ক গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের অংশ’, তা স্পষ্ট।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোনোকিছুরই রাজনীতির বাইরে নয়। ফলে ঘটনাক্রমের নেপথ্যে নানা পক্ষের নানামুখী রাজনীতিকেও অস্বীকার করার জো নেই। হাটহাজারীর আগে বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে এমন স্বতঃস্ফূর্ত, ঐক্যবদ্ধ ও আপোসহীন আন্দোলন খুব একটা হয়নি। মাদ্রাসার পরিচালনা কাঠামোর তীব্রতার জন্যেই ছাত্রদের কথা বলার সুযোগ নেই মাদ্রাসায়, আন্দোলন তো পরের বিষয়।

কিন্তু হাটহাজারীর ঢেউ সেই অচলায়তন ভেঙেছে। সামনে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা ব্যবস্থার পরিচালনা ও প্রশাসনের সীমাহীন ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রসঙ্গগুলোকেও। বছরের পর বছর, এমনকি, বংশ পরম্পরায় স্বৈরতান্ত্রিক ও আত্মীয়-স্বজনতান্ত্রিক প্রশাসনের কবলে দেশের শীর্ষ মাদ্রাসাটি কতটুকু নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত হয়েছিল, ছাত্র আন্দোলন সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রধান দাবিগুলোর বাইরে একটিও রাজনৈতিক দাবি তারা উত্থাপন করেনি, হলফ করে তা বলাও যাবেনা। যেজন্য ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করেছে নানা পক্ষ। তবে সময়ের পরিক্রমায় নেপথ্যের প্রকৃত কার্যকারণ আরো স্পষ্টভাবে জানা যাবে।

রাজনীতির প্রসঙ্গে মনে রাখা যেতে পারে যে, শাপলা চত্বরের ঘটনার পর বাংলাদেশ থেকে ইসলামী রাজনীতি বলতে গেলে অন্তর্হিত। তার বদলে চলছে নানা রকমের সুযোগ-সুবিধা বাগানো ও আপোসের ফর্মুলা। দেশের মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বৃহত্তর জনশক্তি দৃশ্যত ঘরে বসে আছে। ফলে হাটহাজারীর ঘটনায় শুধুমাত্র রাজনীতির তালাশ করা বাতুলতা মাত্র। কারণ এই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আন্দোলন বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন ও বিতর্ক তুলে ধরেছে, যেগুলো প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ক।

যার মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বিষয়ক কিছু মৌলিক জিজ্ঞাসা। যেমন: ১. মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও পরিচালনা কাঠামো কতটুকু ইসলামিক বা গণতান্ত্রিক আর কতটুকু পারিবারিক ও অনুগত-বশংবদভিত্তিক? ২. মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান স্টেকহোল্ডার বা ভোক্তা হয়েও পরিচালনা ও সিলেবাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নূন্যতম অংশগ্রহণ ও মতামত প্রদানের সুযোগ আদৌ আছে কিনা? ৩. পরিচালনাকারী ব্যক্তির একচ্ছত্র কর্তৃত্ব আর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে কোনো ভারসাম্য ও সীমারেখা আছে কিনা? ৪. নিয়োগ, পরীক্ষার ফলাফল, চাকুরিচ্যুতির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নাকি ব্যক্তি বা মহল বিশেষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটছে? ৫. কর্তৃপক্ষ প্রধানের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নেওয়া হটকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবিধানের কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা? শুধু হাটহাজারী নয়, দেশের প্রায়-সবগুলো মাদ্রাসার চিত্রই অভিন্ন।

এই সেই দাবী নামা, পুলিশ গেটের বাইরে, ভেতরে আন্দোলন

 

কোনো কোয়ালিটি বা মানদণ্ড না মেনে যেমন মাদ্রাসা খুলে বসা যায়, তেমনি বড় ও প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা ও পরিবীক্ষণ করা হয় না। সামনে একজন ‘হুজুর’কে রেখে ভেতরে চলছে নানান কাণ্ড। হাটহাজারীর তীব্র ছাত্র আন্দোলন যার প্রমাণবহ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের প্রতিষ্ঠানের এমন অন্যায্য, স্বৈরতান্ত্রিক, জবরদস্তিমূলক আচরণ ও কার্যক্রম মানবে কেন? যারা আরব বসন্তের খবর রাখে, মোবাইলে আন্তর্জাতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের হালফিল তথ্য জানে এবং ইসলাম সম্পর্কে গোত্রভিত্তিক মনোভাবের বিপরীতে বিশ্বজনীন শিক্ষা ও দর্শনধারা সম্পর্কে সবিশেষ আপডেট থাকে।

শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাচারী প্রশাসন, অযোগ্য শিক্ষক, অনৈতিক কর্তৃপক্ষকে মানবে কেন? ফলে হাটহাজারীতে যে ঢেউ ছাত্ররা তুলেছে তা মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়নের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা থেকেই করেছেন। আগামী দিনের পরিবর্তমান বিশ্বের আলোকে ইসলাম ও মাদ্রাসা শিক্ষার অগ্রগতির প্রয়োজনেই তারা সরব হয়েছেন। প্রতিষ্ঠান নিজে সংস্কার ও সংশোধনের জন্য প্রস্তুত থাকলে ছাত্রদের বিক্ষোভে শামিল হতে হতো না। তবে ছাত্ররা তৎপর হয়ে শুধু হাটহাজারীতেই নয়, বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক গলদগুলোকে ধরে জোরে ধাক্কা দিয়েছেন এবং সেখানে অন্যায়, অনিয়ম, পশ্চাৎপদতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ সুগম করে দিয়েছেন।

নির্মমভাবে ছাত্র পেটানো, ধর্ষণ, বলাৎকার, অনিয়ম, তছরূপের নানা নেতিবাচক ঘটনায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা যখন প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের আক্রমণের শিকার, তখন হাটহাজারীর ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক ঘটনা। গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সহনশীলতা এবং চাপ ও নৈরাজ্যের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে অটল থেকে মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট সবাইকে আত্মসমালোচনা, সংস্কার ও সংশোধনের পথ দেখিয়েছে যারা, তাদেরকে মর্যাদার সঙ্গে বুঝতে হবে, শুনতে হবে।

কারণ, শুধু হাটহাজারী নয় এবং শুধু মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাতেই নয়, হাটহাজারীর ঢেউ সমগ্র বাংলাদেশে প্রবল প্রণোদনা জাগিয়েছে, বিশেষত সেইসব তরুণ-যুবক আলেম সমাজের মধ্যে, যাদের উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এমন পরিস্থিতিতে ইসলাম-দরদী, মাদ্রাসা-বন্ধু, মুরব্বী সেজে হাটহাজারীর গণতান্ত্রিক ছাত্রআন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে বিপথগামী করা কিংবা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হলে তা হবে একটি সম্ভাবনাময় ইসলামী ছাত্র জাগরণের মূলে কুঠারাঘাত করার শামিল। কিংবা, শিক্ষা বিষয়ক ছাত্রগণআন্দোলনকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার ব্যক্তি বা মহল বিশেষের অপচেষ্টাও আত্মঘাতী বলে চিহ্নিত হবে। অথবা, বাইরে থেকে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেটা আগুনে ঘি ঢালার সমতুল্য হবে এবং হাটহাজারীর স্ফুলিঙ্গের প্রবাহ দাবানলের মতো সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ছড়িয়ে যাবে, যা সরকারি-বেসরকারি কোনো মহলের জন্যেই স্বস্তিদায়ক হবে না।

এ কারণেই ছাত্রদের শিক্ষা বিষয়ক দাবিকে রাজনীতির বিবেচনায় বা ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থে নয়, বরং ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার গতিশীলতা ও বিকাশের স্বার্থে সংঘটিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন রূপে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা ও প্রয়োজনীয় প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করাই সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য কল্যাণকর।

লেখক:
প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।