মেসে থাকায় যেসব সমস্যার সন্মুখীন হয় জবির ছাত্রীরা


Published: 2020-09-02 17:04:27 BdST, Updated: 2020-10-01 04:04:36 BdST

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করলেও এখনো জগন্নাথে থাকার মত কোন আবাসিক হল হয়ে উঠেনি। তাই শিক্ষার্থীদের থাকতে হয় মেসে।মেয়েদের জন্য একটি হলের কাজ চলছে অনেক দিন থেকেই।

হলটির নামকরণ করা হয়েছে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল। ১৬ তলা বিশিষ্ট এই হলে এক হাজার ছাত্রী আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা হলের নির্মাণ কাজ ২০১৩ সালে শুরু হওয়ার পর বেশ কয়েকবার সময় বাড়িয়ে এখনো কাজ চলছে। মেসে থাকায় নানাবিধ সমস্যার সন্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের।সেইসব সমস্যার কথা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনেছেন আমাদের প্রতিনধি মুজাহিদ বিল্লাহ। ৩ পর্বের ধারাবাহিকে আজ থাকছে ২য় পর্ব।

রোকসানা পারভীন, সমাজকর্ম বিভাগ: প্রথমেই বলি পুরান ঢাকা শিক্ষার্থী বাস করার জন্য যথোপযুক্ত জায়গা মোটেও নয়। মেসগুলোতে একদমই আলো-বাতাস নেই।চিপাগলি দিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়।
চলাচলের পথে বাজে কমেন্ট শুনতে হয়,গলিতে অনেকেই আড্ডা দেয়,নেশা করে।একটা মেয়ে একা বের হওয়া অনেক ঝামেলার।

বাড়িওয়ালা মানুষ হিসেবে ভালো।কথা-বার্তাও ভালোই।বাট,ভাড়া যদি ০৭ তারিখে মধ্যে না দেওয়া হয়।তখন বার বার ভাড়া চাই।পানি,গ্যাস সবসময় পাওয়া যায় না।পানি থেকে খুব গন্ধ আসে,স্কিন ইনফেকশন হয়। পানি বাহিত রোগের কবলে পড়তে হয়। টিউশন থেকে ফিরতে রাত হলে কথা শুনতে হয়, হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

রোকসানা পারভীন

 

রাস্তায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা থাকে,যার ফলে দূর্গন্ধ বের হয়,মশা-মাছি তো আছেই।একটু বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় গলিতে,রাস্তায়।

প্রায়সময়ই লাউড মিউজিক চলে আশেপাশের বাসায়, দোকানে, পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া একরুমে ৩জন থেকে ৫ জন গাদাগাদি করে থাকতে হয়।একটা বাথরুম অনেকেই ব্যবহার করতে হয়, যেটা অস্বাস্থ্যকর। সবমিলিয়ে মোটা টাকা গুনতে হলেও, নিজের কোনো স্বাধীনতা নেই।

দিপান্বিতা বৈদ্য, নৃবিজ্ঞান বিভাগ: খুব কম সময় মেসে থাকলেও যতেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। নেতিবাচক ইতিবাচক উভয়ই। যেখানে খারাপ পরিস্থিতি সম্মুখীন বেশি হতে হয়েছে।ভার্সিটি থেকে যাতায়াতের সময় এবং খরচ উভয়ই বাঁচাতে কাছাকাছি উঠেছিলাম। কিন্তু লাভ হয়নি মোটেও। সময় বাচলেও টাকার ভাগীদার গাড়িচালক না হলেও হয়েছে বাড়ির মালিক।

আমি যেখানে থাকি সেখানে থাকা, খাওয়া বাবদ ৫৫০০ টাকা প্রতি মাসে দিতে হয়। এছাড়াও বাড়িতে উঠার সময় জমানত রাখতে হয়েছে ১১ হাজার টাকা। ৫৫০০ টাকা দিয়ে যতটুক আয়েশ, প্রয়োজন আাশাকরা যায় তার অর্ধেকাংশ ও পাওয়া যায় নাহ বরং নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমনঃ খাওয়াদাওয়া নিয়ে যদি বলি, দুপুরের টা মানসম্মত হলেও রাতে টা একেবারই তার ধারে কাছে নাই। অভ্যস্ত নাহলে চেষ্টা করি মানিয়ে নিতে কিন্তু সত্যিই কষ্ট হয়।

দিপান্বিতা বৈদ্য

 

তারপর লিফলেট এ ওয়াইফাই এর সুযোগ সুবিধা অত্যন্ত ভালো লেখা থাকলেও তার বিন্দুমাত্র সুবিধা ভোগ করতে পারি নাহ,নামেই ওয়াইফাই বরং নিজের টাকা দিয়ে এমবি কিনে করতে হয়ে ভার্সিটির নানা অনলাইন ভিত্তিক কাজ এবং পড়াশুনা।

এরপর আসি পরিবেশের কথা নিয়ে। ইভটিজিং এর মতো বাজে পরিস্থতির সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেকসময় এছাড়া অন্যান্যা ভার্সিটির রুমেটের সাথে মানিয়ে নেয়ার যুদ্ধের কথা নাই বললাম সর্বোপরি টাকার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো একটা নিরাপদ আশ্রয়, পরিবার ছেড়ে আসা শিক্ষার্থীদের একটা মাথার উপর নিরাপদ ছাদ, সচেতন পরিবেশের দরকার, যা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

তানজিলা আক্তার, ইংরেজি বিভাগ: আমি তানজিলা সুযোগ পেয়েছিলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার। পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে পর্বত জয়ের মতো সংগ্রাম আর নিজের খরচ নিজে বহন করে চালিয়ে যাচ্ছি পড়ালেখা, স্বপ্ন একটাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। কিন্তু কাতরস্বরে বলতে হয়, দূর্ভাগ্যবশত আমি সুযোগ পাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ছাত্রছাত্রীদের জন্য নেই কোনো আবাসিক সুবিধা আর প্রশাসনের সদয়দৃষ্টি, যা আমার জীবন সংগ্রামের আরো এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা ঘটায়।

অভিভাবকহীন এই শহরে প্রথমেই সম্মুখীন হতে হয় থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তা সমস্যার। ক্যাম্পাসের আশেপাশে থাকা-খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আমরা ৩জন মেয়ে মিলে বাসা নেই একটু দূরে যা আমাদের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ও নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসে ভুগতে হয়েছে নানান শারীরিক সমস্যায়।

তানজিলা আক্তার

 

এছাড়া অভিভাবকহীন হওয়ায় অকারণে বাড়িওয়ালার কটু কথা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হতে হয়েছে।অন্যদিকে, কোনো কারণবশত ভার্সিটির বাস মিস হয়ে গেলে দিনটাই শুরু হয়েছে অবর্ননীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে।অতিরিক্ত রিকশা ভাড়া ও প্রচন্ড যানজটের কারনে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেটে পাড়ি দিতে হয়েছে এবং সম্মুখীন হতে হয়েছে নানান সমস্যার। এই রিকশা একটা গায়ে উঠে পড়েছে, নিজেকে কোনো মতো সামলে উঠতে না উঠতেই পাশে আরেকজনের গা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

পুরান ঢাকা বিশেষ করে রায়সাহেব বাজার থেকে ক্যাম্পাস অবধি যে পরিমাণ মানুষের ভীড় তাতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার এই সমস্যা অনুধাবন করার কথা।নিরাপত্তাহীনতার অপর নাম যেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা। রাস্তার এই মাত্রাতিরিক্ত জ্যাম পার করে কখনো যদি ক্লাসে যেতে দুই মিনিট দেরি হয় সেদিন আর ভাগ্য হয়না ক্লাস করার কপালে জোটে না হাজিরা। ক্যাফেটেরিয়ার খাদ্যমুল্য যেন আগুন ছোয়ার ন্যায়। সব মিলিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবস্থা যেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ব্যবহৃত সেই প্রবাদের মতো- "সর্বাঙ্গে ব্যাথা,ঔষধ দিব কোথা
এ বহ্নির শত শিখা, কে করিবে গণনা।"

শিলা ইসলাম, জার্নালিজম বিভাগ: অনাবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের সীমাবদ্ধতার শীর্ষে অবস্থান করে আবাসন সমস্যা। যার মুখোমুখি হতে হয় অসংখ্য শিক্ষার্থীদের। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে শিক্ষার্থীদের থাকতে হয় মেসে কিংবা সাবলেট হিসেবে। আমাদের দেশের একমাত্র অনাবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় - 'জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়'। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলোর মাঝে অন্যতম সমস্যা হল সংক্রান্ত।

অনাবাসিক বিধায় শিক্ষার্থীরা চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশেই অবস্থান করতে। এছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থীদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় বাড়িওয়ালারা, তারা ভাড়া ভাড়িয়ে দিয়ে সহজেই স্বার্থ হাসিল করে নেয়। অনেক শিক্ষার্থীরা দূরে অবস্থান করে ভাড়াজনিত সমস্যার কারনে। তবে ছাত্রীদের জন্য ব্যাপারটি দুষ্কর প্রায়। যাতায়াত সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে তারা আশেপাশেই থাকে এবং প্রায় প্রতি মাসেই পড়তে হয় আর্থিক সংকটে। এতে টিউশন চালিয়ে অনেক সময় পিছিয়ে পড়তে হয় ক্লাসে।

শিলা ইসলাম

 

শুধুমাত্র যে আর্থিক সমস্যা তা নয়। অস্বাস্থ্যকর খাবার দিনের পর দিন খাওয়ার পর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের, এছাড়াও রয়েছে পরিবেশগত সমস্যা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আক্রান্ত হচ্ছে জটিল রোগে। যেমনঃ টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু সহ নানান রোগের কবলে পড়ছে।

অনেকেই সিনিয়রদের সাথে থাকছে সুবিধার জন্য। সেখানে দেখা যাচ্ছে স্বার্থ হাসিল করার ব্যাপার উঠে আসছে। বিপাকে পড়ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় দেখা যায় অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করতে পারে ছাত্রী হল। দূর করতে পারে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি এবং অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা।

সুমনা, দ্বিতীয় বর্ষ, একাউন্টটিং এ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ: বর্তমানে জবি শিক্ষার্থীরা মেস সমস্যাটা নিয়ে খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে। বাড়িওয়ালারা ভাড়া কমাচ্ছে না আবার বকেয়া ভাড়া না দেওয়া পর্যন্ত বাসা ও ছাড়তে দিচ্ছে না।

সুমনা

 

আর এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার কারণে অনেক জবি শিক্ষার্থী এই ক্রান্তিলগ্নে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সুতরাং কারোর পক্ষেই ভাড়া মিটিয়ে মেস ছাড়া সম্ভব নয়। তাই জবি প্রশাসন কাছে নিতান্তই চাওয়া আমাদের মেস সমস্যা সমাধান করা।

অন্তু হালদার, প্রথম বর্ষ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট: আমরা সবাই ব্যস্ত শহরের ব্যস্তভাবে জীবন যাপন করি, যেহেতু আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সে হিসেবে হল থাকাটা আবশ্যক ছিল, কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সেটা আমাদের নেই যার ফলে আমাদের বিভিন্ন মেসে থাকতে হয়। করোনা মহামারীর প্রকোপ এতোটাই বেড়েছে যার ফলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৬মার্চই বন্ধ ঘোষণা করা হয় আর তখনই আমার মতো গ্রাম থেকে যাওয়া শিক্ষার্থী বাসায় চলে আসে কিন্তু দিন দিন করোনা বাড়ে সাথে বাসা ভাড়াও,

অন্তু হালদার

 

আমরা যে মেসে ছিলাম সে মেসের ভাড়া ৪ মাসে ৫৪ হাজার হয়েছিলো, এই মহামারীর কারণে যেহেতু ইনকাম সোর্সও বন্ধ সেখানে মধ্যবিত্তদের সমস্যা হবারই কথা ছিলে আর সেটাই হয়েছিলো, একদিকে এতোগুলো টাকা সাথে তো পানি বিল, গ্যাস বিল আছেই যদিও ব্যবহৃত হয় নাই তার ওপর বাসা মালিকের ফোনকল, সব কিছু বিচার বিবেচনা করে সবাই মিলে মেসটা ছেড়ে দিলাম,... কারণ জানিনা কখন প্রতিষ্ঠান খুলবে, শুধু শুধু ভাড়া বহন করাটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমাদের মতো হাজারও শিক্ষার্থী বাসা ছেড়েছে।

হল কবে নাগাদ চালু হতে পারে এ ব্যাপারে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোষ্ট ড.এস.এম আনোয়ারা বেগম বলেন, "সরকারের কাছ থেকে যারা হলের দায়িত্ব নিয়েছে তারা আমাদের এখনো বুঝিয়ে দেয়নি।আমরা যত দ্রুত পারি চেষ্টা করছি। লিফট নিয়ে আসা হয়েছে কাজ চলছে। মেয়েগুলোকে হলে তুলে দিতে পারলে আমার খুব ভাল লাগবে।সবকিছু দ্রুত করার চেষ্টা করছি।"

 

ঢাকা, ০২ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।