ঢাবিতে অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল-নেটের বরাদ্দ নেই! বাড়বে শিক্ষা বৈষম্য


Published: 2020-07-25 00:59:16 BdST, Updated: 2020-09-21 15:59:14 BdST

মিজানুর রহমান, ঢাবি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ইন্টারনেট ও ডিভাইস কিনতে সহায়তার কোনো বরাদ্দ নেই।  ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট থেকে এমনটাই জানাগেছে। এনিয়ে চলছে নানান বিতর্ক। আলোচনা আর সমালোচনা চলছে হরহামেশা। তবুও হাক-ডাকের অন্ত নেই। করোনা ভাইরাস জনিত মহামারীর কারণে বন্ধের মধ্যে অনলাইন ক্লাস চালু করলেও শিক্ষার্থীদের চাওয়া অনুযায়ী কিছুই পাবেন না তারা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানসিক বিপর্যয়, ডিভাইস অপ্রতুলতা, ডাটা কিনতে আর্থিক অক্ষমতা, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনা এবং বন্যা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ বঞ্চিত হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা-কার্যক্রম থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ সামাদ প্রস্তাবিত বাজেটের ভূমিকায় উল্লেখ করেন, "অনলাইন ক্লাসের প্রস্তুতি হিসেবে ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে ২০ হাজার টাকা করে স্মার্ট ফোন কেনার জন্য দিলে মোট ৪০ কোটি টাকা খরচ হবে। এই জন্য আমরা সরকারের নিকট ৫০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারি।" এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, "এটা আগের কোষাধ্যক্ষ ড. কামাল হোসেনের একটি চিন্তা। আসলে এখন এমন কোন পরিকল্পনা নেই। "

তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষার্থীদের সমস্যা আছে সেটা আমি জানি। মনে করো প্রকৃত পক্ষে স্মার্টফোন নেই ১০% শিক্ষার্থীর। এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্মার্ট ফোন দেওয়ার জন্য কাজ করে তখন আসলেই যাদের প্রকৃত দরকার তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হবে। অনেকেই স্মার্ট ফোন থাকা সত্ত্বেও আবেদন করবে না সেটার নিশ্চয়তা কী? এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন আছে।"

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ও ইন্টারনেট প্যাকেজ সরবরাহের কোন বরাদ্দ নেই। তাহলে সমাধান কী জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা আছে। ডিভাইস সমস্যা ও আর্থিক কারণে যারা অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারছেন না তাদের জন্য আমদের পরিকল্পনা আছে। আমরা সব কিছু বিবেচনা করে এগুচ্ছি। করোনার কারণে পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদি খাতে ব্যয় কমেছে। এই অর্থ দিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার পরিকল্পনা করছি।

অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ ডিভাইস সমস্যা, ডাটা ক্রয়ে আর্থিক সমস্যা ও নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনা ও বন্যার কারণে উপস্থিত হতে পারছেন না। এটা কি শিক্ষা বৈষম্য তৈরি করছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম আর শারিরিক উপস্থিতিতে ক্লাস এক বিষয় নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যাতে পরস্পর সংস্পর্শে থাকতে পারে তাই এই অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা। যারা অনলাইন ক্লাসের আওতায় আসতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কথা অবশ্যই বিবেচনা করবে। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার পুষিয়ে দেওয়া সাংবিধানিক দায়িত্ব।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক খান ক্যাম্পাসলাইভ২৪ কে বলেন, ছেলেমেয়েদের অনলাইন ক্লাসের মধ্য দিয়ে বিরাট মানসিক বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের। এসব ছেলেমেয়েদের অনলাইন ক্লাসের মধ্য দিয়ে বিরাট মানসিক বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে বলে আমি মনে করি। ছেলেমেয়েদের উপর মানসিক চাপ তৈরী হচ্ছে। তারা Depression এ ভুগছে। এবং এই Depression creates frustration among students and which leads them to alienation and alienation can lead to destruction of life like committing suicide.

তিনি আরো বলেন, মানসিক চাপটা কেমন? শিক্ষার্থীরা মনে করছেন অনলাইনে শিক্ষকেরা ক্লাস নিচ্ছেন। তাদের উচিত ক্লাসে যুক্ত হওয়া নয়তো তারা পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু অনেকেরই ডিভাইস নেই, ডাটা কিনতে আর্থিক সমস্যা, নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনা রয়েছে। "

তিনি আরো বলেন,"আমার শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে গাছে উঠছে, বাজারে যাচ্ছে। আমার কক্সবাজারের ছেলেটি বাড়ি থেকে ৫ কি.মি দূরে গিয়ে ক্লাস করছে। উচ্চ বর্গীয় শিক্ষকেরা ঘরে ফ্যানের বাতাসে বা শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের শীতল বাতাসে ক্লাস নিচ্ছেন আর সেখানে শিক্ষার্থীরা বাইরে আসতে বাধ্য হচ্ছে অনলাইনে ক্লাস করার জন্য। ফলে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কি বিশ্ববিদ্যালয় নিবে?"

ড. রাজ্জাক বলেন,"আমার মতে অনলাইন ক্লাস না নিয়ে শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ ঠিক রাখতে সপ্তাহে একবার হলেও ফোনে কথা বলা। এখন উচিত শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মুক্ত করতে কাজ করা। অথচ অনলাইন ক্লাসের নামে একটা অংশকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। এই অনলাইন ক্লাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে কারণ এর মাধ্যমে শিক্ষাকে অধিকার না মনে করে সুযোগ করার একটি প্রক্রিয়া চালু হলো এবং এটা,অমানবিকতা ও অনৈতিক। "

"শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে অতিমারির সময় অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে সেটা কলংকের ঘটনা হবে বলে। "

ড. রাজ্জাক আরো বলেন, "যদি আমাদের অনলাইন ক্লাসে যেতে হয় তাহলে সময় নিয়ে ভেবে চিন্তা করে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো মিটিয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু করতে হবে। আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার নিজেরও ল্যাপটপ নেই। অনলাইন করার প্রয়েজনীয় উপকরণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষকে সরবরাহ করতে হবে। এবং শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে বুঝাতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে এবং থাকবে। অন্যথায় এটার পরিণাম হবে খুবই খারাপ।"

ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ মোবাইল ফোন ও মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করে চারটি অনুষদ ও একটি ইনস্টিটিউটসহ সাতটি বিভাগের ২০০০ শিক্ষার্থীদের উপর চালানো একটি জরিপে উঠে এসেছে যে , মোট ৪৩% শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করতে অপারগ। এদের মধ্যে ৩৩% ইন্টারনেট বিড়ম্বনার স্বীকার, ১২% শিক্ষার্থীর ডিভাইস নেই, ৯% শিক্ষার্থী মানসিকভাবে সমস্যায় আছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রবিউল আলম ক্যাম্পাসলাইভ টুয়েন্টিফোর কে বলেন, "আমরা দিনে এনে দিনে খায়। ব্যয়বহুল ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে অনলাইন ক্লাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আর নেট স্পিড খুবই কম। একটা ক্লাস করতে অসংখ্যবার অটো ডিসকানেকটেড হয়ে যায়। আমার মোবাইল খুবই নিম্নমানের। আমার ঘরে ক্লাস করার মতো পরিবেশ নাই। বইপত্র কিছু সঙ্গে নাই তাই অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে পড়তে সমস্যা হচ্ছে। "

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাহিদ আলী ক্যাম্পাসলাইভ কে বলেন," গত এক মাসের মধ্যে ৩ বার বন্যা হইছে, একবার বন্যা হলে ২-৩ দিন বিদ্যুৎ থাকে না, ২-৩ দিন পর বিদ্যুৎ আসলে সীমিত সময়ের জন্য আসে। আমার এমবি থাকার পরও মোবাইলে চার্জ না থাকার কারণে আমি কয়েকটি ক্লাস করতে পারিনি। বন্যা হলে একটা দুশ্চিন্তা সবসময় থাকে, পানি কখন আর বেড়ে গিয়ে ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করে ফেলে। এমন অবস্থায় ক্লাস করাটাও এক ধরনের বিলাসিতা। এদেশে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে হয় সবসময়, কি আর করার! মানিয়ে নিচ্ছি মহামান্য শিক্ষকদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত।"

মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রেহেনা আক্তার ক্যাম্পাসলাইভ টুয়েন্টিফোরকে বলেন, "আমার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের এলাকার নেটওয়ার্ক প্রশাসন স্লো করে দিয়েছে। ফলে নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় ক্লাস করতে পারি না। একটু পর পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিরাপত্তার কারণে কিছু শিক্ষক ক্লাস রেকর্ড করতেও দেই না। অন্যদিকে গ্রামে বিদ্যুৎ এর সমস্যা আছে। একটু বেশি বৃষ্টি হলে দুয়েকদিনের জন্য বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যায়।অনলাইন ক্লাসের ফলে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাগিব নাইম ক্যাম্পাসলাইভ ২৪ কে বলেন,"আমাদের ক্যাম্পাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। অথচ এদের কথা বিবেচনা না করেই, কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়ে শতবর্ষ উদযাপনের নামে অনলাইন ক্লাস ছাত্রদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হলো।"

তিনি আরো বলে, "আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান সবার সমস্যা দেখুন, সমাধান করে তবেই অনলাইন ক্লাস নিন। আমাদের একজন সহপাঠীও যেন বঞ্চিত না হয়। শিক্ষা কার্যক্রমকে বৈষম্যের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবেন না।"

ঢাকা, ২৪ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।