করোনায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে কুষ্টিয়ার এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা?


Published: 2020-07-16 16:37:40 BdST, Updated: 2020-09-21 15:11:26 BdST

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এর সংক্রমণ যেনো অচিরেই দ্বিগুণ হয়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। করোনা যেন স্থবির করে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নানা অস্থিরতায় আর সংকটে সকলেই দিন পার করছে। তেমনি এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী যেন তার ব্যতিক্রম নয়।

চলতি বছর এপ্রিলে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বছর যেন যায় যায়, সময় কখনও থেমে থাকে না। অনেকে আবার ইন্টার থার্ড ইয়ার বলে বিদ্রুপ করা থেকেও বিরত নেই এই অভিশপ্ত ব্যাচ এইচএসসি ২০২০ কে। চলুন জেনে নেওয়া যাক তাদের করোনার ক্রান্তিলগ্নের দিনগুলোর কথা। জানালেন ক্যাম্পাসলাইভকে: আল আমিন ইসলাম নাসিম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া।

সামিউল রহমান কোয়েল, ঈদগাপাড়া (বিশ্বাস বাড়ী) কুষ্টিয়া, কুষ্টিয়া সরকারি সেন্ট্রাল কলেজ, বিভাগ: বিজ্ঞান।

সামিউল রহমান কোয়েল

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন: বর্তমানে টক অফ দা টপিক যেটা তা হলো করোনা। যা আতঙ্কিত করেছে পুরো বিশ্বকে। তবুও থেমে নেই জীবন। সবাই ব্যাস্ত নিজেকে নিয়ে। আমি একজন এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী। আমার ব্যস্ততাও কোনো অংশে কম নয়। পরিক্ষা নিয়ে যখন নানান কল্পনা জল্পনা, করোনা তখন সব থামিয়ে দিলো। সময় এবং নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

করোনা আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বাড়াছে তবে থেমে নেই সময়। থেমে নেই আমাদের মতো ছাত্ররা। ভয় হতাশা যে মনের ভিতর দাগ কাটছে না তা নয়। সময় যত বাড়ছে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ততো কমে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস, টিভি চ্যানেলে লাইভ ক্লাস সব কিছু নিয়ে লেখা পড়া থেমে নেই। আমার মতো অন্য সব বন্ধুরাও চাপে আছে। সবার সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ আছে। তবুও আগের কাটানো সময় গুলা খুব মিস করি।

সব সময় এটাই ভাবি যে, কবে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে? কবে আবার সবার সাথে দেখা হবে? তবে মানবিক দ্বায়িত্ব পালন করছি। এই করোনার ভিতর অসহায় মানুষদের সহায়তা করার চেষ্টা করছি। মানুষ বাঁচে আশায়, দেশ বাচে ভালোবাসায়। এই ভালোবাসার অস্ত্র দিয়েই একদিন জয় করতে পারবো কোভিড ১৯ কে এটাই প্রত্যাশা করছি।

খন্দকার ফাইয়াজ হাসান অদ্রি, পিটিয়াই রোড কুষ্টিয়া, কুষ্টিয়া সেন্ট্রাল কলেজ, বিভাগ: বিজ্ঞান।

খন্দকার ফাইয়াজ হাসান অদ্রি

 

ফাইয়াজ ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন: একটা ভাইরাস মানুষের জীবনে যে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলতে পারে কোভিড ১৯ ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীবাসীদের প্রতিনিয়ত তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। চার মাস অর্থাৎ প্রায় ১২০ দিন এর বেশি ঘরে আছি। আর এটাও জানিনা যে গৃহবন্দি হয়ে আর কত দিন এভাবে থাকতে হবে। বেশিরভাগ সময় কাটছে পরিবারের সাথে। কখনো ছোটবোন কে সাথে নিয়ে ছাদে ঘুড়ি উড়াচ্ছি। মা কে কাজে সাহায্য করছি।

লেখাপড়া নিয়ে পরিক্ষার আগে যে সিরিয়াসনেস কাজ করে সেটা এখন অনেক অংশেই কমে গেছে। আমরা শিক্ষার্থীরা এবং আমাদের বাবা মা সবাই একটা অনিশ্চয়তার ভিতর আছি কবে এইচ.এস.সি পরিক্ষা হবে আর কিভাবেই বা ভার্সিটির ভর্তি পরিক্ষাগুলো নেওয়া হবে। বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে কিভাবে পড়বো? বোর্ড এক্সাম এর জন্য পড়বো নাকি ভাার্সিটির এক্সাম এর জন্য ?রুটিন করে বাসায় নিজের মতো করে পড়ার চেষ্টা করছি।

কখনো ইউটিউব থেকে সহায়তা নিচ্ছি,কখনো অনলাইন ক্লাস গুলোতে এটেন্ড করে পড়ালেখার প্রতি মনোযগী হওয়ার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। কখনো মোবাইলে গেমস খেলছি। ঘরে বসে নিজেকে যতটা গ্রুমিং করা যায় তাই চেষ্টা করছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সময় প্রার্থনা করা, যেনো এই মহামারি থেকে সমগ্র পৃথিবী রক্ষা পায়। যত দ্রুত সম্ভব আমরা আমাদের আগের জীবনে ফিরে যেতে পারি এটা প্রত্যাশা করছি।

নাজমুন নাহার মিম, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া, কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, বিভাগ: বিজ্ঞান।

নাজমুন নাহার মিম

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে খোলামেলাভাবে জানালেন: করোনা ভাইরাস নামেই আতঙ্কিত এখন সবাই। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত এ বছরের এইচএসসি ব্যাচ। তাদের এইচএসসি পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায়, তারা না পারছে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে, না পারছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুতি নিতে।

মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছে সকলেই। আদৌ পরীক্ষা হবে কিনা এই দোটানায় পড়ে আছে সবাই। পড়াশোনার চেয়ে এখন অনলাইনে দেশের আপডেট নিউজ জানতে ব্যস্ত সবাই। সবার একই ভয়, কখন কি হয়! এই মানসিক দুশ্চিন্তার কারনে তারা পারছে না পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে। কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না জানা পর্যন্ত কেউই নতুন করে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারছে না। এমতাবস্থায় ভালো ফলাফল করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে শিক্ষার্থীদের জন্য।

ইরাদা তুদ দিনিয়াত, কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, কুষ্টিয়া, বিভাগ। বিজ্ঞান।

ইরাদা তুদ দিনিয়াত

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন: সময় চিরবহমান। কিন্তু ২২শে মার্চ,২০২০ এ করোনা পরিস্থিতি সংকটের কারণে এইচ.এস.সি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করায় আমাদের (এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থীদের) সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। এসময় আমাদের ভর্তি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। অথচ আমরা এইচ.এস.সি পরীক্ষা নিয়ে বিষণ্ণতা ও মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতায় দিন পার করছি। সাথে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে এক অনিশ্চয়তার ভেতরে দিন কাটছে আমাদের সকলের।

অনলাইন ক্লাস করছি ঠিকই কিন্তু পূর্বের মতো লেখাপড়ার গতি ও মনোবল কোনোটাই পাচ্ছি না। এই ঘরবন্দি জীবনে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও আমি আমার “Skill Develop” এবং বিভিন্ন “Online Course” করার চেষ্টায় তৎপর হয়েছি। চিত্রাঙ্কন,রান্না শেখা,গান শোনা, “Power-Point Presentation”, “Photoshop” এবং “Driving” আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে কার্যকরী।

সেই সাথে কিছু “Basic Programing Course”-এ অংশ নিয়েছি, যা পরবর্তীতে আমাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সহায়ক হবে। যেহেতু আমার উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা সেহেতু “Spoken English” কোর্স-এ অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছি, বন্ধুদের সাথে ভিডিও কলে আড্ডা দিচ্ছি এবং প্রতিনিয়তই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেন আমরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারি। প্রত্যাশা অতি শীঘ্রই সকলে দেখা পাবো এক সুস্থ ধরণীর।

আরাফাত রহমান রুপু, ঈদগাপড়া, কাটাইখানা মোড়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, বিভাগ: বিজ্ঞান।

আরাফাত রহমান রুপু

 

আরাফাত ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন: এইচএসসি পরিক্ষার্থী হ‌ওয়ার কারনে সবার মাথাতে প্রথম প্রশ্নটা আসবে যে আমার পড়াশুনা কেমন হচ্ছে? পরিক্ষা স্থগিত হওয়ার কিছুদিন একটু পড়াশুনা করছি আমি। তার পরে লকডাউন খুবই বিরক্তিকর লাগতে থাকে, পড়াশুনা করতে আর ভালো নাগে না। সেই যে বাদ গেছে আজ দুই মাস মতো কোন পড়াশুনা হই না। মাঝে মাঝে অনলাইন ক্লাস গুলোতে একটু উকি ঝুকি মারি। শহরে এক ঘরে বন্ধি থাকতে আর না পেরে গ্রাম এর বাসাই চলে আসছি। গ্রাম এর খোলামেলা পরিবেশ এ এখন মোটামুটি মনটা ভালো থাকে। কিন্তু পড়াশুনা সেই যে বাদ গেছে আর হচ্ছে না।

এই জন্য হইতো মানুষ বলে সময় এর জিনিস সময়ে হইয়ে গেলে ভালো হই। মাঝে মাঝে পুরোপুরি উদাসিন হইয়ে যাই। মনে হয় যে যাক জীবনে যা আছে হবেই। আবার কখনো খুব চিন্তা হয় যা পড়ছিলাম ভুলে যাচ্ছি, আমারতো সিলেবাস সব শেষ হয়েছিলো না সেই গুলা পড়া দরকার এই রকম নানান কথা। পড়াশুনার কথা আর বলতে ভালো লাগছে না। এইটা বাদ দেই কিভাবে দিন কাটাচ্ছি সেই কথায় আসি। গ্রামে এসে ঘুড়ি বানাইছি বেশ কিছু।

নিজের ঘুড়ি, আসে পাশের মানুষে ঘুড়ি বানানো এই ভাবে দিন গুলা যাচ্ছে। বৃষ্টিতে খালে বিলে ছোট মাছ হইছে প্রচুর। মাঝে মাঝে মাছ ধরতেও যাই গ্রাম এর বন্ধু বান্ধদের সাথে। রাতে সময় কাটে সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুদের সাথে গ্রুপ কল অথবা খুদে বার্তা দিয়ে, আর মোবাইলে বন্ধুদের সাথে গেম খেলে। এখম এক্সাম দিয়ার কোন মন মানসিকতা আর নাই। এভাবে কোন লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ছাড়াই দিনে গুলো পার করছি।

জিসান আহমেদ, টালি পাড়া, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কুষ্টিয়া, বিভাগ: বিজ্ঞান।

জিসান আহমেদ

 

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানালেন: তখন এইচএসসি এর প্রস্তুতির সবে ৬০% হয়েছে, পরীক্ষা সন্নিকটে । আফসোসের সাথে বার বার বলতাম “ইস! আর যদি একটা মাস পেতাম তাহলে ধুমায়ে পড়ব, পড়ে সব শেষ করে ফেলতাম”। সেই আমি ৩ মাসে একাডেমিক বই খুলেই দেখিনি। কোয়ারেন্টিনে থাকার দরুণ একাডেমিক পড়া কিছু না হলেও শেখা থেমে নেই। মায়ের কাছে অনলাইন ক্লাস করার অজুহাতে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েছি তারপর থেকেই সারাদিন ইউটিউব ঘাঁটি, চেষ্টা করি কিছু নতুন কিছু শিখতে, ভালোই লাগে।

এর মাঝেই ফটোশপ, পাওয়ারপয়েন্টের কাজ শিখে ফেলেছি। একঘেমেমি লাগলে মাঝে মাঝে একটু উপন্যাস পড়ি, লেখালেখি করি, গান শুনি আবার মাঝে মাঝে বিকালে ছাদে উঠে একটু ঘুড়ি ওড়ায় (নতুন শিখছি)। মাঝে মাঝে বন্ধুদের কাছে রিভিউ শুনে কিছু বাংলা আর্টফিল্ম দেখি। রসকষহীন অনলাইন ক্লাস করার চেষ্টা করেছিলাম দুদিন, তৃতীয় দিন থেকে আর মন বসেনি। প্রতিদিন বই ধরব ধরব বলেও ধরা হয় না, আবার কোনো একদিন যদি ধরেও ফেলি আধা ঘন্টার বেশি ধৈর্য্য কুলায় না। তবে টেনশান যে হচ্ছে না তা না।

কিন্তু অলসতার কাছে এসব টেনশান বরাবরই হার মেনে যাচ্ছে। আমি বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছি, মনে হয় এরকম আরো বেশ কিছুদিন গেলেও তেমন কিছু মনে হবে না। খবরের চ্যানেল দেখা বাদ দিয়েছি আজ এক মাস হলো, টিভিতে মানুষের বোকামির গল্প শুনতে শুনতে বিরক্ত হওয়ার থেকে ঘরে বসে একটা উপন্যাস পড়ে ফেলা ভালো। বলা বাহুল্য, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি চিন্তায় পড়েছি।

কেন জানি মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। কারণ হয়তো ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার। কিন্তু এছাড়া আর আছেই বা কী যা দিয়ে একটু অবসর কাটাবো? তাই চাই খুব শীঘ্রয়ের সাথে যেন এই মহামারীর প্রকোপ থেকে আমরা সুস্থ হয়ে বেঁচে উঠতে পারি, যেন আবার সোনালি রোদের আঁচে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি, ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

ঢাকা, ১৬ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।