৮০ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস, সেমিস্টার ফাইনাল, ভর্তির বিপক্ষে (কিস্তি-১)বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এসব কি হচ্ছে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে!


Published: 2020-05-03 22:21:14 BdST, Updated: 2020-05-29 23:06:44 BdST

মনিরুজ্জামান মাজেদ ও সাজ্জাদ হোসেন: কোভিড-১৯ একটি নাম। একটি মরণঘাতি আতঙ্ক। এর ভয়াল থাবায় লন্ডভন্ড বিশ্বের সব আয়োজন। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি আজ দিশেহারা। হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতা ও রাষ্ট্র নায়করা। গবেষকরা রাত দিন গবেষণা করেও পাচ্ছেন না কুলকিনারা। এর ছোবলে প্রায় আড়াইলাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়ে লড়ছেন লাখ লাখ মানুষ। বিশ্বের প্রায় সব ক’টি বড় বড় শহর ও অনেক দেশ আজ লকডাউনে আছে। এর ভয়াল ঢেউ আমাদের দেশেও লেগেছে। এর থাবায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৭ জন বনি আদম।

দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা বন্ধ। লকডাউনে দেশ আজ বন্দি। লাখ লাখ মানুষ আজ কর্মহীন। ‍শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা চলে গেছেন গ্রামে গঞ্জে। সেখানে নেই পর্যাপ্ত বিদ্যুত। নেই যথেষ্ট ইন্টারনেট সার্ভিস। এই পরিস্থিতে গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস, সেমিস্টার ফাইনাল ও অন্যান্য পরীক্ষা এবং ভর্তি কার্যক্রম কীভাবে চালাতে পারবে সে বিষয়ে গাইডলাইন ঠিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়।

পুরো বিশ্বের মত বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক মহামারি করোনার ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত। জীবন আর জীবিকার দ্বন্দে জীবন রক্ষার তাগিদে কার্যত স্তবির হয়ে পড়েছে সমগ্র দেশ । করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ প্রতিরোধে সরকার ১৬-ই মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ পাঠদান ও পরীক্ষাসহ শিক্ষাকার্যক্রম অনলাইনে মাধ্যমে শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পরীক্ষা গ্রহণ, ভর্তি ও নতুন সেমিস্টার স্থগিত করার নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়-ইউজিসি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির ত্রি-পক্ষীয় সভায় অনলাইনে ক্লাস,পরীক্ষা, ভর্তি, নতুন সেমিস্টারের কার্যক্রম শুরু ও টিউশন ফি আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-ইউজিসি ও বেসকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির ত্রি-পক্ষের এ সিদ্ধান্তে বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের মতে ইউজিসির এ সিদ্বান্ত শুধু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে , সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করা হয় নি। এতে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থক্ষুন্ন হবে।

এ বিষয়ে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাঈম রহমান আকাশ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমার বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপে। যেখানে জনসাধারণের জীবণ ধারণের সকল সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত সেখানে ইন্টানেট এর ভালো সংযোগ আর স্প্রিড আশা করা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। সম্প্রতি যে অনলাইনে ক্লাস হয়েছিল তাতে আমি সঠিকভাবে যোগদান করতে পারি নি শুধু মাত্র নেটওর্য়াক ও ইন্টারনেট এর স্প্রিড এর কারণে । এর মাঝে আমাদের পাঠ্যক্রমের সিলিবাস প্রায় শেষ কিন্তু আমার জানার সীমাটা শূন্যেই রয়ে গেছে । এমন পরিস্থিতিতে যদি অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় তাহলে তা আমার জন্য কতটা কল্যাণ কর হবে তা আপনারাই বুঝতে পারছেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাঈমা তুশি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। আর এ পরিস্থিতিতে অনলাইনে ক্লাস করা অবশ্যই সময়োপযোগী কিন্তু সবার জন্য না বিশেষ করে যারা ঢাকার বাইরে আশে পড়াশুনার জন্য। অইেশ জায়গায় ইন্টারনেট ভালোমতে কাজ করে না। অনেকের হয়ত প্রতিদিন ডাটা প্যাকেজ কিনার মতও সুযোগ নেই। এসব সমস্যার জন্য বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস আর এক্সাম এর প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এমনপরিস্থিতি অনলাইনে পরীক্ষা এবং নতুন সেমিস্টার চালুর সিদ্ধান্ত কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন স্টাডিজ এন্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী লিজা ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, "আমাদের দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা উন্নত না ৷ আর আমার কাছে অনলাইনে ক্লাস ব্যর্থ চেষ্টা হবে বলে মনে হচ্ছে । আর এই লকডাউনের মত সময়ে অনলাইন ক্লাসের মানেই হয় না । গ্রামে নেটওয়ার্কের অবস্থার কথা সবার ই জানা। সব দোকান বন্ধ থাকলে আমরা ফ্ল্যাক্সি করবো কিভাবে? তাই আমি মনে করি এই সময় অনলাইন ক্লাস নিতান্তই অযৌক্তিক ।"

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হলেও বাংলাদেশের সর্বত্র নেটওর্য়াক এবং ইন্টারনেট অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা দেওয়ার মত পর্যাপ্ত নয়। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু ঢাকা শহরে নয় বরং সমগ্র দেশে আনাছে কানাছে থেকে উঠে আসে। শুধু ঢাকা শহরে এসি রুম আর ব্রডব্যান্ডের ইন্টানেট ব্যবহার করে যদি মনে করা হয় আমরা অনলাইনে সমগ্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত তাহলে তা অবিবেচকের মত সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু বলে আমি মনে করি না। বরং আমি মনে করি বাংলাদেশে বর্তমান অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র মাহফুজুল আলম ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমাদের শিক্ষকরা যথেষ্ট মান-সম্পন্ন হলেও তারা অনলাইলে পাঠদানের অভ্যস্ত নয় বিধায় আমরা গুণগত মান-সম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এটি সুস্পষ্ট ভাবে ব্যবসায়ী মনোভাবকে প্রধান্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুন্ন করা ছাড়া আর কিছু নয়। নীতিনির্ধারকদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সক্ষমতা এবং সীমবদ্ধতার কথা চিন্তা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষার্থী মোঃ আশিকুর রহমান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ইউজিসি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের কল্যানের কথা একবার ভাবা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার পর আমি কোন রকমে আমার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বাসায় চলে আসি। আমার নোট বই থেকে শুরু করে সবই ঢাকাই রয়ে গেছে যা ছাড়া আমি কোন মতেই অনলাইনে পরীক্ষা দিলে ভালো করতে পারবো না। এমন পরিস্থিতি শুধু আমার না বরং প্রায় সকল শিক্ষার্থীরই বর্তমান অবস্থা । এমন পরিস্থিতিতে কোন ভাবেই পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।

গ্রীণ ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষার্থী ফাবিহা আহমেদ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, বলেন, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থীরা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যারা একটু আলোকিত ভবিষ্যৎ এর আশায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়েছে। আর এ করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় সবার পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে হয়ত মানবেতর জীবন যাপন করছে । এ পরিস্থিতি টিউশন ফি দেওয়ার সামর্থ্য সিংগভাগ শিক্ষার্র্থীর নেই আর এসময় এমন সিদ্ধান্তকে আমি অমানবিক সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু বলবো না।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সাদমান ফাহিম অর্পণ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমার এক বন্ধুর বিল্ডিং করোনা রোগী পাওয়া গেছে । বর্তমানে তারা সবসময় ভয়ে আছে কখন তারাও আক্রান্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে সে কোন অনলাইনে পরীক্ষার জন্য মানষিকভাবে প্রস্তুত নয়। শুধু আমার বন্ধু নয় , ইতিমধ্যে অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমরা ক্যাম্পাস ও পরীক্ষার জন্য কতটুকু মানষিকভাবে প্রস্তুত সেদিক বিবেচনা করে ইউজিসির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেন, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা না করে ব্যবসায়ী মনোভাব নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। আমার মত অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা নিজে পার্টটাইম জব ও টিউশানির মাধ্যমে তাদের টিউশন ফি দিয়ে থাকি। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে আমাদের বেঁচে থাকাটা অনিশ্চিত সেখানে টিউশান ফি দিয়ে অনলাইনে ক্লাস পরীক্ষা দেওয়া নিছক বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এদিকে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ল্যাব ক্লাসে নিচ্ছে। বিশেষ করে ফার্মাসি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি এসব বিষয়ের অনলাইনে ল্যাব ক্লাস প্রহসন ছাড়া আর কিছু মনে করি না আমি। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ছাত্রদের কথা বিবেচনা করে যথাযথ ছাত্রবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুরোধ করবো।

প্রসঙ্গত গত বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় একটি সভা। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস, সেমিস্টার ফাইনাল ও অন্যান্য পরীক্ষা এবং ভর্তি কার্যক্রম চালাতে । সভায় সংযুক্ত ছিলেন উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ইউজিসি চেয়ারম্যান এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা। জানাগেছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস, সেমিস্টার ফাইনাল ও অন্যান্য পরীক্ষা এবং ভর্তি কার্যক্রম কীভাবে চালাতে পারবে সে বিষয়ে গাইডলাইন ঠিক করবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে করা হবে।

এ ব্যাপারে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ, বলেন, যেহেতু ছুটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তাই আমাদের ভিন্ন চিন্তায় যেতে হচ্ছে। মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটি করা হচ্ছে। তবে এর সুদুর প্রসারী বিষয় নিয়ে তিনি সুস্পস্ট কিছু বলতে পারেন নি। ইন্টারনেট সুবিধা ও বিদ্যুৎ সমস্যার বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যান।

ঢাকা, ০৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।