কুর্মিটোলা হাসপাতালের বেহালদশা, স্বজনদের কান্না!


Published: 2020-04-24 13:39:17 BdST, Updated: 2020-05-28 17:18:23 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। বাইরে টিপটপ। ভেতরে যেন সদরঘাট। এই কথাটি এখন এই হাসপাতালকে ঘিরে প্রচলন হয়ে গেছে। অনেক ভূক্তভোগী আর রোগীরা এমনটি বলেছেন। তাদের ভাষ্য হাসপাতালের বেহালদশা। স্বজনদের অভিযোগের যেন অন্ত নেই। নানান অব্যবস্থাপনা, অক্সিজেন এর অভাব আর নোংরা পরিবেশ ছাড়াও নানান সমস্যায় জর্জরিত এই হাসপাতালটি। মশারি, বালিশ, চাদরেরও অভাব।

চাহিদা পাঠালে উল্টো তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কেন তারা এত বেশি চাহিদাপত্র দেন। দেশের প্রথম সারির হাসপাতালের এখন এই দশা। করোনা রোগীদের ভরসাস্থল হিসেবেই পরিচিত এই হাসপাতালটি। নানান অভিযোগের ব্যাপারে জানতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল হাসান ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদকেও পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য:


বেসরকারি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের একজন সিনিয়র রিপোর্টার শাহাদাত হোসেন বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর তার মনে হয়েছে জীবনে এতটা অসহায় কোনদিন বোধ করেননি। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস 'পজিটিভ' এটি জানার পর শুরুতে তিনি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সহকর্মীদের সহায়তায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার ভাষায়, "হাসপাতালে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে নয়দিন পার করেছি আমরা। ওখানে মনে হয়েছি রোগীরা একেবারে অভিভাবকহীন। আমি খুবই অসহায় বোধ করেছি। দেখতাম চোখের সামনে রোগীরা মারা যাচ্ছে। লাশ ওয়ার্ডেই পড়ে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা"।

''যেহেতু নির্দিষ্ট ব্যক্তি লাশ দাফন করেন হয়তো তাদের সংখ্যা কম কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, সেকারণে হয়তোবা। কিন্তু এতে একজন অসুস্থ রোগী যে এমনিতেই ভয়ে আছে তার মনের অবস্থা কী হয়?" তিনি বলেন। শাহাদাত হোসেন আরো জানান, হাসপাতালে তিনি খুবই অসহায় বোধ করেছেন। তিনি হাসপাতালে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলছিলেন ২৪ ঘণ্টায় একজন চিকিৎসক আসতেন। অনেক দূর থেকে কথা বলে চলে যেতেন।

বেসরকারি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের একজন সিনিয়র রিপোর্টার

 

নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে একটি মানুষকেও পাওয়া যায় না। এরকমও হয়েছে যে নার্স আসেনি বলে একবার সকালের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া হয়নি। চিকিৎসক দিনে একবারও আসেনি সেটিও হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘কিন্তু একজন চিকিৎসকের কথায় আমার ভরসা পাওয়ার কথা। তার কথায় আমার মনোবল বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে মানসিক সাপোর্ট দেয়ার কেউ ছিল না।" অন্যান্য সুবিধাদির বর্ণনা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তিনি যে ওয়ার্ডে ছিলেন সেখানে একশো মতো রোগী ছিল। এতজন রোগীর জন্য মাত্র তিনটি টয়লেট, তিনটি গোসলখানা। শাহাদাত হোসেন এক পর্যায়ে রোগী বাড়তে শুরু করার পর চিকিৎসকদের অনুরোধ করে তার বাড়ি চলে যান।

মহামারি করোনা আক্রান্ত এক রোগীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় নির্মম মৃত্যু নিয়ে সন্তানের আবেগঘন এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুকে দুবার লাইভে এসে তিনি তুলে ধরেছেন ঘটনার আদ্যপান্ত। যেখানে ফুটে উঠেছে কুর্মিটোলা হাসপাতালের নার্স, স্টাফ ও আনসারদের চরম নির্মমতা। যা রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে প্রতিটি মানুষের মন ও মননকে। নানা বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এ তলা সেই তলা করে অনেক কষ্টে ৫ তলায় গিয়ে বাবার জন্য একটি বেডের ব্যবস্থা করি। সেটি ছিল একেবারেই নোংরা অপরিচ্ছন্ন। কোনো চাদর বা বালিশও ছিল না। তারপরও বাবাকে বসাই। কিন্তু রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি থাকতে দেবে না বলে আমাকে বের করে দেয়। মাকে রেখে নিচে চলে যাই।

বাবার শ্বাসকষ্ট থাকায় মা নার্সদের কাছে গিয়ে অক্সিজেনের কথা বলেন। তখন তারা জানায়, আগে রোগীকে দেখবে এবং তখন যদি মনে হয় তার অক্সিজেন প্রয়োজন তা হলে দেবে। অনেকক্ষণ পর একজন এসে বাবার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। দেখার পর অক্সিজেন দেন। এতে তিনি কিছুটা ভালো অনুভব করেন। এর মধ্যে আবারও বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তখন মা আবার গিয়ে অক্সিজেন চান।

এতে ওখানকার নার্স ও বয়রা মায়ের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করেন। আমি বাইরে ওয়েটিং প্লেসে বসে থাকি। সন্ধ্যার দিকে সেখানকার এক আনসার আমাকে দেখে বলেন, আপনি এখানে কেন বসে আছেন? এখানে বসতে পারবেন না। আমি বললাম আমার রোগী আছে ওপরে, তাই বসে আছি। তখন তিনি বলেন, রোগী থাকলেও এখানে বসতে পারবেন না। আপনি রাস্তার ওই পাড়ে গাছের নিচে গিয়ে বসে থাকেন। আমি সারারাত কষ্ট করে রাস্তায় গাছের নিচে বসে থাকি।

ভুক্তভোগী মনির্মাণ সাহা

 

এদিকে বাবার শ্বাসকষ্ট কষ্টের কথা মা বারবার জানানোর পরও কোনো অক্সিজেন দেয় না তারা। অনেকবার বলার পর একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসে। তবে আমার মা বুঝতে পারে সিলিন্ডারটি খালি। সেটা লাগানোর পরও বাবার কোনো কাজ করছিল না। হাসপাতালটিতে শুরু থেকে আমরা কোনো ডাক্তার দেখিনি। শুধু নার্স ছিল। জানা যায় ওই যুবক নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ আখড়া এলাকা থেকে ভিডিও বার্তায় বলেন, আমার বাবার করোনা পজিটিভ ছিল। তিনি ১৯ এপ্রিল সকাল ৭টায় ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

অক্সিজেন নাই:

এদিকে জানা গেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষিত রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু এখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই অক্সিজেন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। করোনা আক্রান্ত এসব রোগী প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছটফট করলেও পর্যাপ্তসংখ্যক অক্সিজেন ফ্লো-মিটার সরবরাহের অভাবে তাদের অক্সিজেন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতালটিতে অক্সিজেনের অভাবে বয়স্ক এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে-এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। হাসপাতালটির চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও নার্স বলেছেন, হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ভর্তি রোগীর সংখ্যানুপাতে ফ্লো-মিটারের প্রয়োজনীয় সরবরাহ না থাকায় অনেক রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও তা দেয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি কিন্তু ওপেন সিক্রেট।

হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা আরো জানান, করোনা পজিটিভ রোগীদের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে সিলিন্ডার থেকে ফ্লো-মিটারের মাধ্যমে তাদের সবসময় অক্সিজেন দিতে হয়। স্বাভাবিক রোগীর চেয়ে করোনা রোগীরা অধিক পরিমাণ অক্সিজেন গ্রহণ করেন। ফলে একজন রোগীকে অক্সিজেন দেয়ার সময় অন্য রোগী শ্বাসকষ্টে ভুগলেও তাদের কিছুই করার থাকে না। অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট না থাকলেও এগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফ্লো-মিটার চেয়ে তারা স্টোরে চাহিদা দিয়েছেন, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করা হয় না। ফলে সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।

একজন নার্স ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক সময় রোগীর স্বজনদের মুখে অভিযোগ শুনি, নার্সদের ডেকে পাওয়া যায় না। অক্সিজেন, মশারি, বালিশ, চাদর ইত্যাদি চেয়ে পান না। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্টোর থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কোনো কিছুই সরবরাহ করা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘১০০ জন রোগীর জন্য ৫০টি অক্সিজেন ফ্লো-মিটার চাইলে দেয়া হয় মাত্র ২০-২৫টি। চাহিদা পাঠালে উল্টো তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয় কেন তারা এত বেশি চাহিদাপত্র দেন। রোগীদের প্রয়োজনেই চাহিদা দিই, বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। কিন্তু যত দোষ হয় আমাদের।’

কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে তারা নিজেরাই সন্তুষ্ট নন বলে জানান হাসপাতালটির চিকিৎসক-নার্সরা। তারা জানান, করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে গিয়ে নিজেরা সংক্রমণের ভয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকেন। তারপরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী না পেলে তাদের কিছুই করার থাকে না। কেবল রোগী নয় তাদের স্বজনরাও আমাদের গালমন্দ করেন। কিন্তু কি করা সাপ্লাই তো নাই।

এদিকে জধানীর বিমানবন্দর সড়কে অবস্থিত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে দিনকে দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে তিনটি করোনা পজিটিভ ওয়ার্ড, একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড, কেবিন ব্লক ও ইমার্জেন্সিতে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী বিশেষ করে করোনা পজিটিভ ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন ফ্লো-মিটারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে চোখের সামনে রোগীদের ছটফট করে মরতে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না বলে মনে করছেন হাসপাতালটির চিকিৎসক-নার্সরা।

ঢাকা, ২৪ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।