করোনার ভয়াল ঝড় আসছে ঢাকায়, দ্রুত শনাক্তকরণের আহবান


Published: 2020-04-08 13:10:14 BdST, Updated: 2020-05-31 14:26:27 BdST

শান্তনা চৌধুরী: করোনার কড়াল গ্রাসে কাঁপছে রাজধানী ঢাকা। চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক। কখন কি হয়ে যায়। করো জ্বর কিংবা একটু কাশি হলেই ভয়ে হয়ে উঠেন কাতর। তবে এটাও সত্য ঢাকায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়বে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুনভাবে শনাক্ত হচ্ছেন করোনা রোগী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, কয়েক হাজার মানুষের পরীক্ষা করে কিছুই বোঝা যাবে না। কয়েক লাখ শনাক্তকরণ পরীক্ষা হলে দেশে আক্রান্তের হার বোঝা যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তাই শনাক্তকরণ পরীক্ষার পরিধি সারাদেশে বাড়ানো হচ্ছে। 

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল জানান, কয়েক লাখ মানুষের পরীক্ষা করা হলে দেশে করোনার সার্বিক অবস্থা বোঝা যাবে। এদিকে সুস্থরা ফের আক্রান্ত হওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। মাদারীপুরের একজন রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পর আবার আক্রান্ত হয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।

ঢাকার ৬২ স্পট লকডাউন :
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর রাজধানী ঢাকার ৬২টি এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার ও বুধবার ১০টি ও ১৩টি এলাকা লকডাউন করা হয়। এসব এলাকার কেউ এখন বাইরে বের হতে পারবেন না, সেখানে কেউ ঢুকতেও পারবেন না। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে সংক্রমণের শুরুর দিকে মিরপুরের টোলারবাগে রোগী পাওয়ার পর ঐ এলাকা আগেই লকডাউন করা হয়।

এরপর একে একে পুরান ঢাকায় খাজে দেওয়ান লেনের ২০০ ভবন, মোহাম্মদপুর এবং আদাবরের ছয়টি এলাকা, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সামনে, বছিলা ও আদাবর এলাকার কয়েকটি বাড়ি ও রাস্তা। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক নারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সেখানকার একটি রাস্তা লকডাউন করা হয়।

মহাখালীর আরজত পাড়ার একটি ভবন, বসুন্ধরা এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল (সাবেক অ্যাপোলো হাসপাতাল) সংলগ্ন এলাকা, বুয়েট এলাকার একাংশ, ইস্কাটনের দিলু রোডের একাংশ, মিরপুরের টোলারবাগ, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের একটি সড়ক এলাকা, কাজীপাড়ার একটি অংশ, কলাবাগান থানাধীন সেন্ট্রাল রোডের কিছু অংশ, সোয়ারীঘাটের কিছু অংশ, মিরপুর-১০-এর ৭ নম্বর রোড।

পল্টনের কিছু অংশ, আশকোনার কিছু অংশ, নয়াটোলার একাংশ, সেনপাড়ার একটি অংশ, মীর হাজিরবাগের একাংশ, নন্দীপাড়ার ব্রিজের পাশের এলাকা, মিরপুর সেকশন ১১-এর একটি সড়ক, লালবাগের খাজে দেওয়ান রোডের একটি, ধানমন্ডি-৬-এর একটি অংশ, উত্তর টোলারবাগ, মিরপুর-১৩ ডেসকো কোয়ার্টার, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী, পশ্চিম মানিকনগর, নারিন্দার কিছু এলাকা, গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনে একটি বিউটি পারলার, ইসলামপুরের একাংশ। এসব এলাকা পুলিশি পাহারা রয়েছে। দিনরাতে কাউকে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। এলাকায় সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ রাখা হচ্ছে।

করোনার ম্যাপ

 

করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার চার সড়ক লকডাউন করেছে পুলিশ। ৭ এপ্রিল বিকালে এ চারটি সড়কের প্রবেশপথ লকডাউন করা হয়। ফলে এসব সড়কে কাউকে প্রবেশ এবং বের হতে দেয়া হচ্ছে না। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত লকডাউনের আওতায় থাকবেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। সড়কগুলো হলো-মোহাম্মদপুরের রাজিয়া সুলতানা রোড, তাজমহল রোডের ২০ সিরিয়াল রোড, বাবর রোডের কিছু অংশ ও বসিলার পশ্চিম অংশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর ফাড়ির ইনচার্জ মো. প্লাবন আহমেদ রাজিব বলেন, আমরা জানতে পেরেছি মোহাম্মদপুরের চারটি রোডে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। জানার সঙ্গে সঙ্গে ওসি স্যার ও এসি স্যারের নেতৃত্বে আমরা এই রোডগুলো লকডাউন করি। তিনি বলেন সবাই বাসায় থাকবেন।

আমরা সতর্ক হওয়ার জন্য মাইকিং করছি। বিশেষ প্রয়োজন হলে ৩৩৩ তে কল দিয়ে আপনার কাঙিক্ষত সেবা পেতে পারেন। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ আবদুল আলীম জানান, মোহাম্মদপুরের চারটি রোডে ছয়জন করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ায় রোডগুলো লকডাউন করে দিয়েছি। এ রোডে কারও প্রবেশ ও বাহির হওয়া নিষেধ করা হয়েছে।

এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ রোধে রাজধানী পুরান ঢাকার খাজা দেওয়ান লেনের প্রথম ও দ্বিতীয় লেনের ১৫০-২০০ বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার জানান, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা থেকে পুরান ঢাকার খাজা দেওয়ান লেনের প্রথম ও দ্বিতীয় লেনের ১৫০-২০০ বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানীর গুলশান, বাড্ডা, নিকুঞ্জ ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আরও চার বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিএমপি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।

তাদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এর আগে ঢাকায় মোট ৮৫ জন করোনা রোগী ছিল। ঢাকার পরেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা। সেখানে ছিল ২৭ জন। সবমিলিয়ে ঢাকায় মোট করোনা রোগীর সংখ্যা একশ ছুই ছুই। বর্তমানে দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে (মঙ্গলবার পর্যন্ত) ১৭ জনে।

রাজধানী অনেকটাই লকডাউন:
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এড়াতে ঢাকা থেকে যাতে কোনো লোক বাইরে যেতে না পারে এবং ঢাকার বাইরে থেকে কোনো মানুষ যাতে ঢাকায় আসতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। গত রোববার তিনি এই নির্দেশনা দেন। ফলে আইজিপির এ নির্দেশে লকডাউনের কথা উল্লেখ না করা হলেও কার্যত ‘লকডাউন’ রয়েছে ঢাকা।

রাজধানীর বাইরে থেকে ঢাকার ভেতরে মানুষ প্রবেশ ও ঢাকা থেকে বাইরে যাওয়া বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা বলেছেন, সরকারের নির্দেশে সামাজিক দূরত্ব মানার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। খবর বিবিসি বাংলার। এমন সময় পুলিশ এই উদ্যোগের কথা জানালো, যখন লকডাউন উপেক্ষা করে শনিবার হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে ঢাকায় প্রবেশ করে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার এক পর্যায়ে গার্মেন্টস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত বদলে আবার ছুটি বাড়িয়ে দেবার ঘোষণা দেয় মালিকদের সংগঠন। কিন্তু ততক্ষণে বহু শ্রমিক পায়ে হেঁটে, পণ্যবাহী যানবাহনে চড়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছে। রোববার সকালে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তাতেই দেখা যায় বিভিন্ন কারখানা অভিমুখে শ্রমিকদের ঢল।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা রানা জানান, 'এরই মধ্যে যারা ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন, তাদের আমরা আটকে দিয়েছি এবং নিজ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছি। এছাড়া নতুন করে জড়ো হয়ে কাউকে ঢাকার দিকে রওনা হতে দিচ্ছি না আমরা।' সোহেল রানা আরও জানান, আমাদের হাইওয়ে পুলিশ, রেঞ্জ পুলিশ ও জেলা পর্যায়ের পুলিশ সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুমের সাথে সমন্বয় করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। তবে মানুষের চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জরুরি সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের পণ্য পরিবহন অব্যাহত থাকবে।

বিদেশ ফেরতদের অনেকেই ছিলো আক্রান্ত:
জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পথে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ১৩ জন দেশে প্রবেশ করেছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করেছেন। সেখান থেকেও ওই প্রাণঘাতি ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ দিকটিও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন। মাত্র ৫/৬ হাজার মানুষ বাদে বাকি লোকদের মধ্যে কতজন আক্রান্ত তা কেউ বলতে পারছে না। শনাক্তের বাইরে থাকা লোকগুলো সমাজে মেলামেশা করছেন। নিজের অজান্তেই ছড়িয়ে দিচ্ছেন করোনাভাইরাস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এবং জনগণের জীবনযাপনের প্রক্রিয়ায় কয়েক দিনের মধ্যেই এটি চতুর্থ স্তর বা মহামারিতে পরিণত হতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসা (কন্ট্রাকট ট্রেসিং) বন্ধ করতে হবে। সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পালিয়ে না থেকে জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা, ০৮ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।