ইনোসেন্ট চেহারায় রাবি ছাত্রের ভয়ংকর ফাঁদ : টার্গেট ধনাঢ্য ছাত্রীরা!


Published: 2020-02-11 17:37:31 BdST, Updated: 2020-04-08 14:12:04 BdST

রাজশাহী লাইভ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন মাহফুজুর রহমান সারদ। পড়াশোনা করছেন অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে। এরই মাঝে তিনি ভয়ংকর প্রতারক হয়ে উঠেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে প্রতারণা করে আসছেন তিনি। নিজেকে গরীব ছাত্র পরিচয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছল ও ধনাঢ্য ছাত্রীদের টার্গেট করেন তিনি। প্রথমে বন্ধুত্ব ও পরে গরীব ছাত্র পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেন। পরে মেস ডেটিংয়ের নামে সম্ভ্রম কেড়ে নিয়ে ভিডিও করে রাখেন তিনি। ওই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ছাত্রীদের কাছ থেকে টাকাও আদায় করতেন। ইনোসেন্ট চেহারার আড়ালে তার ওই ভয়ানক প্রতারণার ফাঁদ অবশেষে ফাঁস হয়েছে। মাহফুজসহ প্রতারক চক্রের ৫ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রিমান্ডে বেরিয়ে এসেছে ভয়ানক তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে মেসে ডেটিংয়ে ডেকে সম্ভ্রম কেড়ে নেয়ার ঘটনা প্রকাশের পর থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক তথ্য। ওই ঘটনায় রাবি ছাত্রী মতিহার থানায় মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রহমান বলেন, মাহফুজই হচ্ছে মূল হোতা। সে এমন ঘটনা আগেও করেছে অন্য মেয়েদের সঙ্গে। এই ধরণের ঘটনার কথা মাহফুজ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

এদিকে রাবি ছাত্রীকে সম্ভ্রমহানির ঘটনায় জড়িত মাহফুজের বন্ধু জীবন তার জবানবন্দিতে বলেছেন, মাহফুজ নিজেকে গরীব পরিচয় দিয়ে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর তার পরিকল্পনামতো তার সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। রাবি ছাত্রীটির সঙ্গে ওই ঘটনার আগেও আরও কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে মাহফুজ ও তারা মিলে এমন ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটিয়েছে।

মতিহার থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজ জানিয়েছেন, রাবি ছাত্রীর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়ার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমান সারদকে দুই দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। পুলিশ ইতোমধ্যেই উদ্ধার করেছে সেই ভিডিও। আরেক অভিযুক্ত পলাতক বিশাল সরকারকে খুঁজছে পুলিশ। ধর্ষণের শিকার ছাত্রীটির বাড়ি যশোরে বলে জানা গেছে। নগরীর একটি মেসে থেকে পড়ালেখা করেন। মামলা দায়েরের পর ছাত্রীটি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছেন।

মতিহার থানায় দাখিলকৃত ছাত্রীর এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ২৪ জানুয়ারি অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মাহফুজুর রহমান সারদ তার গার্লফ্রেন্ড একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ডেটিংয়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলার সাঁকারা এলাকার একটি ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। পরে পদ্মার তীর এলাকায় কিছুসময় ঘুরে রাত সাড়ে আটটার দিকে তারা আবার মেসে ফিরে যায়। সেখানে কথা বার্তার এক ফাঁকে মাহফুজ রুমে আটকে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। ওই সময় পুর্ব পরিকল্পনামতো রুমে প্রবেশ করে মাহফুজের ৫ বন্ধু বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাফসান আহম্মেদ, প্লাবন সরকার, জয়, জীবন ও বিশাল তালুকদার। ছাত্রীটি আগন্তক যুবকদের কাউকে আগে দেখেননি। যুবকরা নিজেদের পুলিশের লোক পরিচয় দিয়ে মাহফুজ ও ছাত্রীটিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। এক পর্যায়ে অস্ত্রের মুখে ছাত্রীটিকে মাহফুজের সঙ্গে কয়েকবার ওপেনলি আপত্তিকর সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করে। সেইসব দৃশ্য তারা নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ভিডিও রেকর্ড করেন। পরে বন্ধুরাও ওই ছাত্রীর সর্বনাশ করে।

ছাত্রীটির দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দীর বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিহার থানার এসআই আব্দুর রহমান জানান, ওই রাতে আগন্তক ৫ যুবক ছাত্রীটিকে মাহফুজের সঙ্গে অন্তত তিনবার আপত্তিকর কাজ করতে বাধ্য করেছে। রাত আনুমানিক দুটার সময় মেয়েটির কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে তারা। কিন্তু এতে রাতে পরিবারের কাছে কোন টাকা চাইতে পারেনি মেয়েটি। শেষে তার বান্ধবী ও অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিজের বিকাশ নম্বরে নিয়ে তা যুবকদের একজনের নম্বরে ট্রান্সফার করে দেন। কারণ ওই সময় মোবাইল বিকাশের দোকান খোলা ছিল না। এক পর্যায়ে ওই রাতেই ছাত্রীটিকে মেস থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরের দিন তার কাছে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করে তারা।

এদিকে গ্রেফতার হওয়া জয় ও জীবন শনিবার রাতে গ্রেফতারের পর রোববার বিকেলে রাজশাহী মহানগর হাকিমের আদালতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই জবানবন্দিতে তারা বলেছে, ঘটনার মুল পরিকল্পনাকারী মাহফুজ নিজেই। তারা পরস্পরের বন্ধু। আগের দিন মাহফুজ, প্লাবন সরকার, রাফসান আহম্মেদ, বিশাল তালুকদার, জয় ও জীবন মিলে মেসে বসে পরিকল্পনা করে যে তারা মেয়েটিকে ব্ল্যাকমেইল করবে। মেয়েটির পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। ভালো টাকা পাওয়া যাবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক মাহফুজ তার বান্ধবী ছাত্রীটিকে ডেকে নিয়ে কিছু সময় পদ্মার ধারে ঘুরে বেড়ায়। এরপর মেসে গিয়ে মেয়েটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সর্বনাশ করে। পরিকল্পনা মতো তারা পাশের রুমে অপেক্ষা করছিল। ঘটনা বুঝতে পেরে তারা মাহফুজের রুমে ঢুকে দু’জনকে অনেকটা উলঙ্গ অবস্থায় পেয়ে যায়। এরপর নিজেরা পুলিশ পরিচয়ে ভয় দেখায়। এক পর্যায়ে মাহফুজের সঙ্গে ছাত্রীটিকে তিনবার আপত্তিকর কাজ করতে বাধ্য করে এবং ৫ জনই নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ভিডিও চিত্র রেকর্ড করেন। ওইরাতে যে ১০ হাজার টাকা তারা মেয়েটির কাছ থেকে নিয়েছিল তার মধ্যে থেকে ৩ হাজার টাকা পরদিন মাহফুজকে দিয়ে আসেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রহমান বলেন, মাহফুজই হচ্ছে মূল হোতা। সে এমন ঘটনা আগেও করেছে অন্য মেয়েদের সঙ্গে। এই ধরণের ঘটনার কথা মাহফুজ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
পুলিশ আরও জানায়, ছাত্রীটি ঘটনার পরদিনই যশোরে চলে যায়। মানসিক পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পরিবারের কাছে সব ঘটনা খুলে বলেন। গত ২৭ জানুয়ারি রাতে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে মতিহার থানায় উপস্থিত হয়ে ৬ ছাত্রের বিরুদ্ধে ছাত্রীটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরদিন ২৮ জানুয়ারি এই বিষয়ে ৬ ছাত্রের বিরুদ্ধে মতিহার থানায় মামলা রুজু হয়। মূল অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমানের বাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় জয় ও প্লাবন সরকারের বাড়ি জয়পুরহাট, রাফসান আহম্মেদের বাড়ি রাজশাহী বহরমপুর মহল্লায় ও জীবনের বাড়ি রাজশাহীর কাজলায় ও বিশাল তালুকদারের বাড়ি নাটোর।

এদিকে ঘটনা সম্পর্কে কাজলার সাঁকারা এলাকার মেসবাড়ির মালিক আবুল হাসান জানান, তিনমাস আগে মাহফুজকে মেস করে থাকার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তবে তাদের চালচলন ভালো মনে না হওয়ায় ডিসেম্বর মাসে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল। পরীক্ষা থাকার কথা বলে তারা জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় নিয়েছিল।

ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।