বুয়েটের সেই হলের তিন কক্ষে রাতদিন মদের আড্ডা, গানবাজনা


Published: 2019-10-13 13:37:13 BdST, Updated: 2019-11-22 06:08:42 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের তিনটি কক্ষে রাতদিন চলতো মাদকের আড্ডা। ব্যাগভর্তি মদের বোতল নিয়ে এসব কক্ষে প্রবেশ করতেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় সঙ্গে থাকতো বহিরাগতরাও। সেই রাতে শেরেবাংলা হলের যে কক্ষে (২০১১) বর্বর নির্যাতন চালিয়ে আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয় সেখানেও রাতদিন মদের আড্ডা চলতো। যদিও সেই কক্ষটি এখন তালাবদ্ধ রয়েছে। ওই হলের ২০০৫ ও ৩০১২ নম্বর কক্ষও ছিল টর্চার সেল। এসব কক্ষে ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল বলে অভিযোগ করেন হলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, দারোয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। বহিরাগত নেতাদের নিয়ে এসব রুমে নিয়মিত বসত মদের আড্ডা। হলের একজন দারোয়ান বলেন, বহিরাগতদের নিয়ে তারা (নেতারা) ব্যাগভর্তি মদের বোতল নিয়ে হলে ঢুকতেন। আড়চোখে তাকালেই বকা খেতে হতো। ওই তিনটি রুমের দরজার পাশে সবসময় ১৫-২০ জোড়া জুতা থাকত। রুমের ভেতর রাতদিন চলত মাতলামি। এসব রুমের দেয়ালও হয়তো এসব দেখে কাঁদত। কিন্তু কারও কিছুই করার ছিল না। সবাই মুখ বুজে সহ্য করে গেছেন।

জানা গেছে, আবরারকে যে কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সেটি ছিল টর্চার সেলের মধ্যে অন্যতম। এখান থেকেই সোমবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় চারটি মদের বোতল, চারটি ক্রিকেট স্টাম্প, একটি চাপাতি ও দুটি লাঠি উদ্ধার করেন।

দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আরেকটি টর্চার সেল- ২০০৫ নম্বর কক্ষ। কোনো শিক্ষার্থী নেতাদের মর্জির বাইরে কাজ করলে এ কক্ষে এনে নির্যাতন চালানো হতো। শনিবার কক্ষটির দরজায় দুটি তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। জানালা ও দরজার গ্লাসগুলোও কাগজে ঢাকা। বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে স্যান্ডেল। জানালার গ্লাসের ভাঙা ছিদ্র দিয়ে দেখা যায়, জানালার পাশে একটি টিফিন ক্যারিয়ার। অবশিষ্ট খাবার পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ৪টি আলমারির মধ্যে দুটি খোলা। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে কাপড়-বই-খাতা। প্লাস্টিকের ৩টি ড্রয়ারবিশিষ্ট একটি ওয়্যারড্রপ। আলমারির পেছনে বোতলের ক্যাপ এবং চানাচুরের খালি প্যাকেটে ভরা। চেয়ারের উপর পড়ে আছে একটি কোলবালিশ। মেঝেতে ময়লা চাদর। এ রুমে শুধু একটি খাট। তবে এতে তোষক বা বিছনা নেই। এ রুমে থাকতেন বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ও মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ইশতিয়াক হাসান মুন্না। তিনি একাই থাকতেন। এটি পার্টি রুম হিসেবে ব্যবহার হতো।

হলটির ৩০১২ নম্বর কক্ষে থাকতেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। এটির দরজায় তিনটি তালা ঝুলছে। জানালা দিয়ে দেখা যায়, কক্ষটিতে একটি মাত্র খাট। একটি টেবিল ও একটি উন্নত মানের অফিস চেয়ার রয়েছে। মেঝেতে অত্যাধুনিক ম্যাট। সিগারেটের একাধিক ছাইদানি। পুরো কক্ষে কোনো বই-খাতা চোখে পড়েনি। রুমটি ছিল এ হলের সর্বোচ্চ দলীয় আড্ডার জায়গা। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এ রুমে এসে আড্ডা দিতেন বলে জানা গেছে। ৩০১২ নম্বর কক্ষটির পেছনের দিকে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দার মতো খালি জায়গা। সেখানে একটি চেয়ার। চারপাশে সিগারেটের অসংখ্য ফিল্টার, খালি প্যাকেট। এক কোনায় ১০টি খালি মদের বোতল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঝাড়ুদার বললেন, কক্ষ তিনটিতে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা হতো না। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকতেন নেতারা। বহিরাগত নেতারাও এ রুমগুলোয় রাত কাটাতেন। প্রতিদিনই ৫-৭টি করে মদের বোতল ফেলতে হতো। নেতারা নির্দিষ্ট টয়লেট ব্যবহার করতেন। ভয়ে অন্য শিক্ষার্থীরা তাদের টয়লেট ব্যবহার করতেন না।

জুনিয়র কয়েক শিক্ষার্থীর অভিযোগ ওই কক্ষগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেও ভয় করত। যখন-তখন ডেকে গালমন্দ করত। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসতে বলত। চা-সিগারেট আনাত। একটু দেরি হলে চড়-থাপ্পড়ও মারত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, কক্ষগুলোয় নির্যাতনের শিকার অনেক শিক্ষার্থী এসব বিষয়ে জানাত। কিন্তু কী করব, আমাদের তো কিছুই করার ছিল না। ৩০১২ নম্বর রুমটির ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে এটি কোনো হলের কক্ষ নয়, কারও ব্যক্তিগত অফিস। মেহেদী হাসান রাসেলের ২০১৭ সালেই পড়া শেষ হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ অবৈধভাবে হলের এ কক্ষটি দখল করে ছিলেন কিনি। মদের আসর বসত। সাউন্ড দিয়ে গান বাজানো হতো। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটত বলে জানা গেছে।

ঢাকা, ১৩ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।