রিমান্ডে তথ্য : বুয়েট ছাত্র আবরার কিলিং মিশনে ২৫ ঘাতক


Published: 2019-10-10 02:42:25 BdST, Updated: 2019-10-14 14:37:53 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ কিলিং মিশনে অন্ত:ত ২৫ ছাত্র অংশ নেন। তাদের সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। আবরারকে থেমে থেমে ৫ ঘণ্টা ধরে নির্মম নির্যাতন চালায় ঘাতকরা। দফায় দফায় পেটানোর একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এ মেধাবী ছাত্র। পরে তার লাশ হলের নিচে নিয়ে রাখা হয়। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ ও ভিডিও ফুটেজে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহার শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে রাত ৮টার পর থেকেই শুরু হয় তার ওপর নির্যাতনের পালা। এদিকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবশেষ ফাঁস হওয়া ভিডিওতে আবরারের লাশ পাশে রেখেই খুনিদের শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান এবং ছাত্র কল্যাণের পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতায় লিপ্ত হতে দেখা যায়। এ সময় তাদের সবাইকে নির্লিপ্ত মনে হয়েছে। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগের ঘাতক নেতাদের সঙ্গে হল গেটে রাত পার করেন প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক। এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ৫ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১০ আসামিকে পৃথক ও মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদিকে বুধবার আরও ৩ আসমিকে রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। এ নিয়ে ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকে রিমান্ডে নেয়া হল। তবে যার রুমে নিয়ে প্রথম আবরারকে পেটানো শুরু হয় সেই অমিত সাহাকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে ডিবি পুলিশ বলছে, অমিতকে গ্রেফতারে সম্ভাব্য সব জায়গায় অভিযান চলছে। এদিকে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে অভি নামে বুয়েটের আরও এক ছাত্রকে বুধবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আবরার হত্যায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও গ্রেফতার দেখানো হবে বলে ডিবি জানিয়েছে।

সূত্র বলছে, ৬ আগস্ট রাতে অমিত সাহার রুমে প্রথম দফায় মারধরের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল। তার সঙ্গে মারধর শুরু করেন বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন ও উপসমাজ সেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল। পরে যোগ দেন অনিক, জিওন, মনির এবং মোজাহিদুলসহ অন্যরা। প্রথম দফায় মারধর চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। পরে রাতের খাবার খাওয়ানো হয় আবরারকে। খাওয়ানো হয় ব্যথানাশক ট্যাবলেটও। দেয়া হয় মলম। দ্বিতীয় দফা মারধর শুরুর সময় অনিক ছিলেন সবচেয়ে মারমুখী। আবরার এ সময় বারবার বমি করছিলেন। একপর্যায়ে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্নার কক্ষে। সেখানে আবরারের শরীরের ওপর অনিক ক্রিকেট স্ট্যাম্প ভাঙেন। পরে আরেকটি স্ট্যাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। তৃতীয় দফার মারধর শুরু হয় মুন্নার কক্ষে। তখন মধ্যরাত। নির্মম পিটুনিতে আবরার লুটিয়ে পড়েন। এরপর নিথর দেহ টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন ঘাতকরা। মাঝ সিঁড়িতে যেতেই তারা বুঝতে পারেন আবরার মারা গেছেন। সিঁড়িতেই মরদেহটি রেখে তখন ওই স্থান ত্যাগ করেন তারা। সূত্র জানায়, এরপর এ নিয়ে তারা যোগাযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। সংশ্লিষ্টরা ঘাতকদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, তোমাদের কিছুই হবে না। তোমরা হলেই অবস্থান কর।

এদিকে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যারা নির্বিঘ্নে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তারাই রাতে দীর্ঘ একটি সময় কাটিয়েছেন হল প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান ও বুয়েট ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে। ঘটনার পর তারা বেরিয়ে হলের গেটেই অবস্থান করেন। সকালের দিকে হল সরগরম হয়ে উঠলে শুরু হয় ঘাতকদের ছোটাছুটি। সবচেয়ে বেশি মারধর করা অনিক ওরফে মাতাল অনিক দৌড়ে চলে যান তার রুমের দিকে। পরে ডাকা হয় ডাক্তার। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা ওই ডাক্তার আবরারকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। এর ২ মিনিট পর খুনিরা একটি স্ট্রেচারের ব্যবস্থা করেন। স্ট্রেচারটি সিঁড়ির মুখে বারান্দায় রাখা হয়।

এর ২০ মিনিট পর লাশের কাছে আসেন প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। পরে প্রভোস্ট এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে খুনিরা নিজেদের মতো করে ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন। চশমা পরা রাসেল এবং সবচেয়ে বেশি মারধর করা অনিককে প্রভোস্টের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় পাশে ছিল অন্য খুনিরাও। ঢেকে রাখা কাপড় সরিয়ে আবরারের নিথর দেহে নির্যাতনের চিহ্ন দেখেও অনেকটা নির্ভার ভঙ্গিতে ছিলেন প্রভোস্ট এবং ছাত্রকল্যাণ পরিচালক।

ডিবির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আবরার ছিল খুনিদের টার্গেটে। তাদের ধারণা ছিল সে ছাত্রশিবির বা অন্য কোনো ইসলামী ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তেমনটিই মনে হয়েছিল খুনিদের কাছে। এজন্য তারা আবরারকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে ওইদিন আবরারকে ডেকে পাঠানো হয়। আবরার ২০১১ নম্বর কক্ষে যাওয়ার পরপরই তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়া হয়। ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে প্রথমে তাকে শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জেরা করা হয়। এরপর শুরু হয় মারধর।

এদিকে নতুন করে ৩ আসামি রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। বুধবার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেন রিমান্ডের আদেশ দেন। তারা হলেন- দিনাজপুরের মাহাতাব আলীর ছেলে মো. মনিরুজ্জামান মনির (পানিসম্পদ বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ), জয়পুরহাটের আতিকুল হোসেনের ছেলে আকাশ হোসেন (সিই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ) ও সিরাজগঞ্জের আবদুল হামিদের ছেলে সামছুল আরেফিন রাফাদ। এদের মধ্যে প্রথম দু’জন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। আর রাফাদ তদন্তে আগত সন্দিগ্ধ আসামি। আসামিদের প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। আবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে শিক্ষার্থী আবরারকে শেরেবাংলা হলের তার রুম থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়। ৭ অক্টোবর রাত আড়াইটা পর্যন্ত ওই হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমের ভেতর নিয়ে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে ক্রিকেট স্ট্যাম্প ও লাঠি-সোটা দিয়ে মারধর করে।

মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে আবরারের মৃতদেহ ফেলে রাখে। মামলাটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। এজন্য আসামিদের ব্যাপক ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে রিমান্ডে নেয়া প্রয়োজন। আগের দিন বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ আসামির ৫ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত।

ঢাকা, ১০ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.ম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।