হোটেলে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ছাত্রীকে হত্যার আগে ধর্ষণের অভিযোগ!


Published: 2019-05-03 21:36:47 BdST, Updated: 2019-07-19 21:18:33 BdST

মৃদুল ব্যানার্জি : আমার মেয়েটা খুব হাসিখুশি ছিল। সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। আমাদের কথার বাইরে সে কোনদিন কাজ করেনি। আমার একমাত্র আদরের এই মেয়েটিকে চিরদিনের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। মৃত্যুর আগে লালসার শিকার হতে হয়েছে তাকে। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

এনিয়ে থানায় অভিযোগ দিতে চেয়েছি, পারিনি। জিডি করতে চেয়েছি, পারিনি। উল্টো পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে অপমৃত্যুর মামলার জন্য চাপ দেয়া হয়েছে। পোস্টমর্টেম ছাড়াই আমার কাছে মেয়ের লাশ হস্তান্তর করতে চেয়েছে পুলিশ। মেনে নেয়নি। অনেক পীড়াপীড়ি করে আমার মেয়ের লাশ পোস্টমর্টেম করিয়েছি।

এখন পোস্টমর্টেমের রিপোর্টের অপেক্ষা করছি। রিপোর্ট পেলেই আমি আদালতে মামলা করবো। তবে একমাস পেরিয়ে গেলেও পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পাচ্ছি না। এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ছাত্রী মরিয়ম চৌধুরীর বাবা মোস্তাক চৌধুরী।

জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল রাজধানীর সম্রাট নামে একটি আবাসিক হোটেল থেকে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ছাত্রী মরিয়ম চৌধুরীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় ওই হোটেল থেকে অপর এক ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট খেয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তৃতীয় কোন পক্ষের লালসার শিকার হয়েছেন ওই ছাত্রী। হোটেল কর্তৃপক্ষকে ধরলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে বরে মন্তব্য তাদের।

নিহত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রী মরিয়মের বাবা মোস্তাক চৌধুরী ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কমকে বলেন, আমার মেয়ে ওই হোটেলে যাওয়ার কোন কারণ নেই। তাকে অপহরণ কিংবা অন্য কোন উপায়ে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে যে ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তার সঙ্গে আমার মেয়ের কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। সম্পর্ক থাকলে আমরা অবশ্যই জানতে পারতাম। আমার মেয়ে আমাদের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করতো।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বাসিন্দা মোস্তাক চৌধুরী ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কমকে বলেন, গত ২ এপ্রিল প্রথমে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হয় আপনার মেয়ের আইডি কার্ডটি পাওয়া গেছে সেটি নিয়ে যান। তখন আমি আমার মেয়েকে ফোন করলে তেজগাঁও থানার ওসি পরিচয় দিয়ে একজন আমার সঙ্গে কথা বলেন, তিনি জানান আপনার মেয়ের একটি দুর্ঘটনা হয়েছে আপনি থানায় চলে আসেন। পরে থানায় গিয়ে জানতে পারি হোটেল সম্রাট থেকে আমার মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সঙ্গে সজল নামে এক যুবকের লাশও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় আপনার মেয়ে যৌন উত্তেজক খেয়ে মারা গেছে। এসময় আমাকে অপমৃত্যুর মামলা করতে বলে পুলিশ। আমি রাজি না হওয়ায় থানায় আমাকে ৩ ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়।

আমার মেয়েকে পরিকল্পিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের ওই অভিযোগ পুলিশ কোনো আমলে নেয়নি। উল্টো ঘটনার দিন পুলিশ বিনা পোস্ট মর্টেমে লাশ আমাদের কাছে দিতে চেয়েছিল। থানায় অন্তত তিন ঘণ্টা বসে ছিলাম। আমি ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নেইনি। আমার মেয়ের সঙ্গে ওই ছেলের কোনো পরিচয় ছিল না।

মারিয়াম তার খালার বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়, তাহলে কিভাবে আমার মেয়ে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে হোটেলে উঠল? অথচ তাদের কাছে বিয়ের কোনো কাগজপত্রই ছিল না। এমনকি হোটেল কর্তৃপক্ষ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যন্ত দেখায়নি। আমরা হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করতে চেয়েছি। কিন্তু সেটা না করে আমার মেয়ের মোবাইল, সিম রেখে দিয়ে এখন পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা দিয়েছে।

আমার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই। হোটেল কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় নিলে মরিয়ামের মৃত্যুর আসল রহস্য বের হবে বলেও মোস্তাক চৌধুরী দাবি করেন। তার ধারণা, মরিয়ামকে অন্য কোথাও হত্যা করে এখানে এনে লাশ ফেলা হয়েছে।

মোস্তাক চৌধুরী বলেন, ‘তার এক মেয়ে এক ছেলে। মরিয়াম বড়। ছোটবেলা থেকে আমার মেয়ে ও ছেলে সব সময় ঝামেলা এড়িয়ে চলত। এলাকায় কখনো কারও সঙ্গে বিবাদে জড়ায়নি। কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা কিংবা মাদকের সঙ্গেও মেয়ে জড়িত ছিল না। কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এমন কিছু কখনো আমাকে ও তার মাকে বলেনি সে।

‘আমরা পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। গত ৩০ দিনে তারা একটা ফোন দিয়েও খোঁজ নেয়নি। আমরা ফোন দিলে বলে, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা এখনো একটি মামলা পর্যন্ত নেয়নি। তারা বলে, কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন। তারা যৌন উত্তেজক ট্যাবলেটের কথা বলে বিষয়টি আড়াল করতে চাইছে। তারা হোটেল কর্তৃপক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।’ মেয়ে হত্যার বিচারের জন্য বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন তিনি।

মোস্তাক চৌধুরী বলেন, আমি পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। কোর্টে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে জানি না কবে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট পাবো। হোটেল সম্রাট কর্তৃপক্ষকে ধরলে হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করে মোস্তাক চৌধুরী বলেন, হোটেল কর্তৃৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী আমার মেয়ে হোটেলে উঠেছে ১ এপ্রলি রাত আটটায়।

পরদিন ২ এপ্রিল বিকেল চারটায় হোটেল কর্তৃপক্ষ টের পায় তার মৃত্যু হয়েছে। তারা পুলিশকে খবর দিয়েছে বিকেল সাড়ে ৪ টায়। এর আগে হোটেল কর্তৃপক্ষ কেন জানলো না ওই কক্ষে কি হচ্ছে। তারা কি সকালে রুম সার্ভিসের জন্য কাউকে পাঠায়নি। না পাঠিয়ে থাকলে কেন পাঠায়নি। দুপুরেও কি কেউ কোন খোঁজ নেয়নি। না নিলে কেন নেয়নি। বিকেলে কেন তারা বিষয়টি টের পাবে।

মোস্তাক চৌধুরী অভিযোগ করেন হোটেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সকালেই টের পেয়েছিল। কিন্তু তারা বিষয়টি নিয়ে সময় ক্ষেপন করে পুলিশের সঙ্গে দেনদরবার করেছে। পুলিশকে ম্যানেজ করে বিকেলে লাশ উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় নিলে মারিয়াম ও সজলের মৃত্যুর আসল রহস্য বের হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মোস্তাক চৌধুরী আরও বলেন ওই হোটেলের ৮০৮ নম্বর কক্ষে আমার মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই কক্ষের যে বাথরুম রয়েছে তার উপরে বিশাল খোলা জায়গা আছে যেটা দিয়ে সহজেই বাইরে যাওয়া যায়। নিশ্চই হত্যাকারীরা ওই অংশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে এমনটাও হতে পারে বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর বাবা।

উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল ফার্মগেটের আবাসিক হোটেল সম্রাটের ৮০৮ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মরিয়াম চৌধুরী ও তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র আমিনুল ইসলাম সজলের ও লাশ। সজলের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌর এলাকার হরিপুর গ্রামে।

আর মরিয়মের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ও হোটেল কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে জানায়, যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট সেবন করে দুজন মারা গেছে। সজলের পকেটে ডুমেক্স-৬০ নামে দুটি যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট পাওয়া গেছে। তা দেখেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় পুলিশ। পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুজনের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আত্মহত্যাও করেননি তারা। তবে চিকিৎসকদের দাবি, এই ট্যাবলেট সেবনে কোনো পুরুষ মারা যেতে পারে না। এ ছাড়া নারীর এই ট্যাবলেট সেবনের কথা নয়।

এদিকে মরিয়ামের বাবা মোস্তাক চৌধুরী বলেন, তিনি ফিনল্যান্ড ছিলেন এখন দেশে পার্ক ও দোকানী কাপড়ের ব্যবসা করেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে তাদের এলাকায় অনেক শত্রু রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, এটি একটি রহস্যজনক মৃত্যু। তাছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে নিহত মরিয়মের পিতার অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা শিগগিরই ভিসেরা ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন পাব। তখনই সকল সমস্যার সমাধান হবে। ওসি আরও বলেন, আমরা পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ নিতে কাউকে বলতে পারি না। মরিয়মের পিতার কথার কোন সত্যতা নেই।

ঢাকা, ০৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।