তিন মাসেই সড়কে পিষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ শিক্ষার্থী!


Published: 2019-04-29 14:17:21 BdST, Updated: 2019-12-15 19:00:56 BdST

আদনান মারুফ : সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় পিষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় আগামীর স্বপ্নগুলো। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সড়কে প্রাণ গেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ শিক্ষার্থীর। এরমধ্যে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির দুই ছাত্র নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফরিদুলের মৃত্যু হয়েছে নামাজরত অবস্থায়। হবু বরের সঙ্গে প্রাইভেটকারে ঘুরতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী জারিন জাহরা। এছাড়া প্রিমিয়াম ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাজ্জাদ বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ সড়কে নির্মমতার শিকার হয়েছেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য। উবার মটোতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়েছেন তিনি। নিহতদের প্রায় সবাই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সড়ক নিরাপদ হওয়ার আগেই অনিরাপদ পৃথিবী ছেড়ে তারা না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

সেরা ছাত্রীদের তালিকায় ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লাবণ্য : গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করতেন। স্বপ্ন দেখতেন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ সিজিপিএ পাওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রীর স্বপ্নগুলো পিষ্ট হয়েছে সড়কে।

জানা গেছে, ফাহমিদা হক লাবণ্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে সেরা ছাত্রীদের তালিকায় তার নাম ছিল। এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিজেও তিনি সেরা ছিলেন। তিনি ভিকারুননিসায় প্রথম শ্রেণি থেকে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি। পরে ভর্তি হন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ফেরদৌসী বেগম সাংবাদিকদের বলেন, লাবণ্যর মৃত্যুর সংবাদ তিনি টেলিভিশনের খবরে দেখেছেন তিনি। লাবণ্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল লাবণ্য। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পায় সে। ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে ভিকারুননিসা ছাড়েন লাবণ্য। ক্লাসে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে আচরণে থাকত মুগ্ধতার আবেশ। সবার সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতো ওই মেয়েটা।

২৫ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য। তিনি উবার মটোতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন। এঘটনায় উবার চালক সুমন ও কাভার্ড ভান চালককে আটক করেছে পুলিশ। পরে জানা গেল ওই চালকের কাগজপত্র ভুয়া। আটকা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন বেপরোয়াভাবে তারা সড়কে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

শখের গাড়িতে নিজেই ড্রাইভ করে ঘুরে বেড়াতেন : নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাকিব চৌধুরী তুর্যর শখ ছিল ঘুরে বেড়ানো। নিজেই ড্রাইভ করে শখের গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন তিনি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসতেন। পড়াশোনার ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতেন। হাসিখুশি সেই ছেলেটির উচ্ছ্বলতা চিরজীবনের জন্য থেমে গেছে। একটি দুর্ঘটনায় তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেছে একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন। গত ৫ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তুর্য।

বন্ধুদের মধ্যমণি ছিলেন সাম্য : বন্ধুদের মধ্যমণি ছিলেন কাজী শেহজাদ হক সাম্য। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির এই ছাত্র নিহত হয়েছেন গত ৪ ফেব্রুয়ারি। তিনি বিবিএর ছাত্র ছিলেন। ময়মনসিংহে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

মসজিদে নামাজের সময়ই প্রাণ হারিয়েছেন ফরিদুল : মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফরিদুল ইসলাম। হঠাৎ একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফরিদুল। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বানুর বাজার এলাকায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ফরিদুল ইসলাম চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) কোরানিক সায়েন্স বিভাগের ৫ম সেমিষ্টারের ছাত্র ছিলেন। তিনি কোরআনের হফেজ ছিলেন। তার বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ার রায়পুর এলাকায়। তিনি প্রয়াত নুর মোহাম্মদের ছেলে ছিলেন।

নিরাপদ সড়ক চেয়েছিলেন সাজ্জাদ : নিরাপদ সড়ক চেয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মো. সাজ্জাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগ থেকে সম্প্রতি পাশ করে শিক্ষানবিশ আইনজীবি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিছুদিন আগেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে সড়কে ট্রাফিক সচেতনতায় কাজ করেছেন। সেই অনিরাপদ সড়কেই প্রাণ গেছে তার। ২৯ মার্চ রাতে অটোরিকশার সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন সাজ্জাদ। বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর : বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী জারিন জাহরার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। আর কদিন বাদেই তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসতেন। তবে ঘর বাঁধার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। হবু বরের সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়ে সড়কে প্রাণ গেছে তার। এমন দুর্ঘটনায় দুই পরিবারে এখন কেবল শোকের মাতম। থেমে গেছে বিয়ের আয়োজন। ২৪ মার্চ (রোববার) রাত সাড়ে ১১ টার দিকে নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন বোট ক্লাবের সামনে দুর্ঘটনায় নিহত হন জারিন। এসময় প্রাইভেট কারে থাকা হবু স্বামী ও তার বন্ধু আহত হন। নিহত জারিন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্সে পড়াশোনা করতেন। হবু স্বামী ইফতেখারের সঙ্গে একটি প্রাইভেট কারযোগে রোববার রাতে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যান জারিন। সেখান থেকে ফেরার সময় তাদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এটি চালাচ্ছিলেন ইফতেখারের এক বন্ধু। দুর্ঘটনায় তিনজনই আহত হন। আহত অবস্থায় জারিনকে হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা, ২৯ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।