তিন মাসে ২ ডজন : অকালে ঝরছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৎ-মেধাবী শিক্ষার্থী!


Published: 2019-04-02 00:26:22 BdST, Updated: 2019-05-24 15:47:45 BdST

মাসুদ সেজান : অকালেই ঝরে যাচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রাণ। দুর্ঘটনায় থেমে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় স্বপ্ন। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোন ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এদের মাঝে কেউ কেউ শিকার হচ্ছেন অপমৃত্যুর। ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কমের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে গত ৩ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা অন্তত দুই ডজন শিক্ষার্থীর প্রাণ গেছে। এদের মধ্যে ভালো শিক্ষার্থীদেরই প্রাণ ঝরে যচ্ছে অকালে। নিহতদের মাঝে কোরআনের হাফেজ ছিলেন ঢাবি ছাত্র কাওসার ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ছাত্র ফরিদুল। ফরিদুল ফজরের নামাজরত অবস্থায় নিহত হয়েছেন ট্রাকচাপায়। এছাড়া সড়কে নিহত আবরার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। সড়কে গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যা করা ওয়াসিমও নামাজি ছিলেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সৎ মেধাবী, নামাজি, সত্যবাদী, বন্ধুসুলভ ও ভালো আচরণের অধিকারী শিক্ষার্থীরাই না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই আছেন ৪ জন। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন মৃত্যুর মিছিলে। তাহলে এটা কী প্রকৃতির খেয়াল! সৃষ্টিকর্তা তার প্রিয় মানুষকে সবার আগে তার কাছে নিয়ে যান। অকালে ঝরে যাওয়া এই শিক্ষার্থীরা হয়তো সেই সৌভাগ্যবানদের কয়েকজন...

নিয়মিত নামাজ পড়তেন আবরার : রাজধানীতে সড়কে নিহত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী অত্যন্ত শান্তশিষ্ট একটি ছেলে ছিলেন। ধর্মের প্রতিও ছিল ছিলেন গভীর অনুরক্ত। নিয়মিত নামাজ পড়তেন তিনি। কারো মনে কোন কষ্ট দিতেন না আবরার। একারণে সবাই তাকে আদর করতেন। তার স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর ডাক্তার হওয়ার। ১৯ মার্চ (মঙ্গলবার) আবরার চিরতরে শায়িত হয়েছেন বনানী কবরস্থানে। আবরারের ছোট চাচা মাসুদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, আবরার ছিল সকলের আদরের পাত্র। নিয়মিত নামাজ পড়তো আবরার। ওর বই পড়ার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল।

মাত্র ১০০ টাকার জন্য সড়কে পিষ্ট করা হয় ওয়াসিমকে : মাত্র ১০০ টাকার জন্য সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ঘোরী মো. ওয়াসিম আহনাফকে নির্মমভাবে সড়কে পিষ্ট করা হয়েছে। এটি কোন দুর্ঘটনা নয় ঠান্ডা মাথায় এই ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে। এঘটনায় আটক ঘাতক বাস চালক ও হেলপার হত্যার বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। গত ২৩ মার্চ বিকালে নবীগঞ্জের টোল প্লাজা থেকে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র উদার পরিবহনের বাসে ওঠেন। এ সময় সহকারী মাসুক মিয়া তাদের কাছে ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। ওয়াসিম ও তার বন্ধুরা ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভাড়া কম রাখার কথা বলেন। এতে সহকারী ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। এক পর্যায়ে তারা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নেমে যান। নামার সময় পেছন থেকে বাসের সহকারী তাদের গালি দেন। এ সময় ওয়াসিম বাসের সিঁড়িতে উঠে হাতলে ধরে কেন গালি দিলেন তা জিজ্ঞেস করছিলেন সহকারীকে। এ সময় চালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। ঠিক তখনই সহকারী মাসুক মিয়া ওয়াসিমকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। সাথে সাথে বাসের পেছনের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ওয়াসিম গুরুতর আহত হন। পরে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর : বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী জারিন জাহরার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। আর কদিন বাদেই তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসতেন। তবে ঘর বাঁধার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। হবু বরের সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়ে সড়কে প্রাণ গেছে তার। এমন দুর্ঘটনায় দুই পরিবারে এখন কেবল শোকের মাতম। থেমে গেছে বিয়ের আয়োজন। ২৪ মার্চ (রোববার) রাত সাড়ে ১১ টার দিকে নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন বোট ক্লাবের সামনে দুর্ঘটনায় নিহত হন জারিন। এসময় প্রাইভেট কারে থাকা হবু স্বামী ও তার বন্ধু আহত হন। নিহত জারিন ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্সে পড়াশোনা করতেন। হবু স্বামী ইফতেখারের সঙ্গে একটি প্রাইভেট কারযোগে রোববার রাতে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যান জারিন। সেখান থেকে ফেরার সময় তাদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এটি চালাচ্ছিলেন ইফতেখারের এক বন্ধু। দুর্ঘটনায় তিনজনই আহত হন। আহত অবস্থায় জারিনকে হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিরাপদ সড়ক চেয়েছিলেন সাজ্জাদ : নিরাপদ সড়ক চেয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মো. সাজ্জাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগ থেকে সম্প্রতি পাশ করে শিক্ষানবিশ আইনজীবি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিছুদিন আগেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে সড়কে ট্রাফিক সচেতনতায় কাজ করেছেন। সেই অনিরাপদ সড়কেই প্রাণ গেছে তার। ২৯ মাচ রাতে অটোরিকশার সঙ্গে মোটর সাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন সাজ্জাদ। বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

ব্যাংকার হতে চেয়েছিলেন ঢাবি ছাত্র কাওসার : ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. কাওসার আহমেদের। কোরআনের হাফেজ এই ছাত্রের পড়াশোনা মাদরাসা লাইনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তিনি সেরাদের তালিকায় ছিলেন। ‘ডি’ ইউনিটে মেধা তালিকায় তিনি ১৭তম হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তার স্বপ্নগুলো সেভাবেই বেড়ে উঠছিল। চতুর্থ বর্ষ শেষে ব্যাংকের জন্য ইন্টার্নিও করেছেন তিনি। স্বপ্ন সফল হওয়ার আগেই তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আগুনে দগ্ধ হয়েছে তার স্বপ্নগুলো। জানা গেছে, মো. কাওসার আহমেদ নিজেই পড়াশোনার খরচ বহন করতেন। সেজন্য কয়েকজনের সঙ্গে শেয়ারে চুড়িহাট্টায় মদিনা মেডিকেল হল নামে ফার্মেসির ব্যবসা শুরু করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) চকবাজারে লাগা আগুনে পুড়ে যায় তার ফার্মেসি। এসময় পুড়ে মারা যায় কাওসারসহ ৬ জন।

মসজিদে নামাজের সময়ই প্রাণ হারিয়েছেন ফরিদুল : মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফরিদুল ইসলাম। হঠাৎ একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফরিদুল। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বানুর বাজার এলাকায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ফরিদুল ইসলাম চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) কোরানিক সায়েন্স বিভাগের ৫ম সেমিষ্টারের ছাত্র ছিলেন। তিনি কোরআনের হফেজ ছিলেন। তার বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ার রায়পুর এলাকায়। তিনি প্রয়াত নুর মোহাম্মদের ছেলে ছিলেন।

বন্ধুকে সঙ্গ দিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন আরাফাত : রাজধানীর চকবাজার ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র। ২০ ফেব্রুয়ারি আরাফাত ইসমাইল নামে ওই ছাত্র চকবাজারে ঘুরতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন। তিনি রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন। বাইক নিয়ে চকবাজারে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। জুমার দিনে তার লাশ অজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ইংরেজি মাধ্যমের এই ছাত্র বন্ধুদের প্রিয়পাত্র ছিলেন।

বোনের বিয়ের বাজারে গিয়ে পুড়ে ছাই নর্থসাউথের রোহান : নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন রোহান। বোনের জন্য বিয়ের বাজার করতে রাজধানীর চকবাজারে গিয়ে আর ফিরে আসা হয়নি রোহানের। পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল। সেই স্বপ্নও তার পুড়ে ছাই হয়েছে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন তিনি।

সকলের প্রিয়পাত্র ছিলেন নুসরাত : বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সম্মান (২০১২-১৩ সেশন) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। তিনি মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া গ্রামের মৃত কবির হোসেন চৌধুরী মেয়ে। এক কন্যা সন্তানের জননী নুসরাত ২১ জানুয়ারি সকালে পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ভাটিয়ারি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগে কোমায় চলে যান নুসরাত। অস্ত্রোপচার শেষে প্রথমে নুসরাতকে নগরের একটি বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের আইসিইউতে রাখা হয়। সেখানেই গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

বন্ধুদের মধ্যমণি ছিলেন সাম্য : বন্ধুদের মধ্যমণি ছিলেন কাজী শেহজাদ হক সাম্য। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির এই ছাত্র নিহত হয়েছেন গত ৪ ফেব্রুয়ারি। তিনি বিবিএর ছাত্র ছিলেন। ময়মনসিংহে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

মোটরসাইকেল চালানোই ছিল তার নেশা : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোটরসাইকেলে করে একাধিকবার বগুড়ায় নিজের বাড়িতে গিয়েছেন জুলহাস জীম। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের নিয়ে মোটরসাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা, হৈ-চৈয়ে মেতে থাকা উচ্ছ্বল সেই ছেলেটির চঞ্চলতা থামিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘাতক পিকআপের চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি। বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের কামারখন্দ উপজেলার ওভারব্রিজ এলাকায় পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এএসএম জুলহাস জীম।

শখের গাড়িতে নিজেই ড্রাইভ করে ঘুরে বেড়াতেন : নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাকিব চৌধুরী তুর্যর শখ ছিল ঘুরে বেড়ানো। নিজেই ড্রাইভ করে শখের গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন তিনি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসতেন। পড়াশোনার ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতেন। হাসিখুশি সেই ছেলেটির উচ্ছ্বলতা চিরজীবনের জন্য থেমে গেছে। একটি দুর্ঘটনায় তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেছে একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন। গত ৫ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তুর্য।

সারাজীবনের কান্না হয়েই থাকবেন ঢাবি ছাত্র তমাল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আব্দুল্লাহ আল ফারুক তমাল সম্প্রতি পাশ করে সংসারের হাল ধরেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভনিং এমবিএ করছিলেন। দুর্ঘটনায় তার স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে। সদা হাস্যেজ্জল এই ছেলেটি আর পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটাবে না। সারাজীবনের কান্না হয়েই থাকবেন তিনি। ২৮ মার্চ বনানীতে আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তমালকে। সেখানে তিনি চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। তমাল ঢাবির ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ই ইউ আর বিডি সলিউশন-এ সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভনিং এমবিএ করছিলেন তিনি।

তার বেয়ে নামার সময় হাত ফসকে নিহত ইয়াসমিন ঢাবিয়ান : রাজধানী বনানীতে অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে তার বেয়ে নামতে চেয়েছিলেন সাইয়্যেদা আমেনা ইয়াসমিন রাতুল। মাঝপথে হঠাৎ ফসকে পড়ে গেলেন তিনি। মাটিতে পড়ে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী ইয়াসমিনের এমন মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রী বন্ধুদের আড্ডা মাতিয়ে তুলতেন। সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তারা।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটির মৌলী ভালো বিতার্কিক ছিলেন : ভালো বিতার্কিক ছিলেন তানজিলা মৌলি মিথি। তিনি Asian University Debating Club (AUDC) এর সদস্য ছিলেন। নিয়মিত বিতর্ক করতেন। মেধাবী ওই ছাত্রী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্যাম্পাসে তাকে সব ভালো কাজের সঙ্গেই দেখা যেত। তিনি একাধারে Dhaka Women's Marathon, Bangladesh Youth Leadership Center (BYLC) ও Doridro Charity Foundation এর ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। বনানীতে অগ্নিকাণ্ডে তিনি মারা গেছেন। পুড়ে গেছে একটি মেধাবী স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীকে হারিয়ে শোকে মূহ্যমান তার পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বন্ধু ও সহপাঠীরা।


পরিবারের সবার প্রিয় মিঠু : বনানীতে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের একজন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শুক্রবার (২৯ মার্চ) ইফতিয়ার মিঠুর মরদেহ তার নিজ বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরবানিয়াপাড়া গ্রামে এসে পৌঁছালে শুরু হয় শোকের মাতম। শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন বাবা মা স্ত্রী পরিবারসহ পুরো গ্রামের মানুষ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। জানা গেছে, তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মিঠু। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে বনানী এফআর টাওয়ারের ১১তলা ভবনে অবস্থিত একটি গ্লোবাল কোম্পানিতে এ্যাকাউন্টিং অফিসার হিসেবে চাকরি নেন।

সুখের সংসারে কান্না হয়েই থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী বৃষ্টি : জারিন বৃষ্টি। উত্তরা ইউনিভার্সিটির এই ছাত্রীর বিয়ে হয় মাত্র তিন বছর আগে। তিনি ইউনাইডেট ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও পড়াশোনা করেছেন। কদিন আগেই স্বামী সাদ নূরের সঙ্গে ম্যারেজ ডে পালন করেছিলেন তিনি। সপ্তাহ না পার হতেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন বৃষ্টি। বনানী ট্র্যাজিডির শিকার হয়েছেন বৃষ্টি। স্ত্রীকে হারিয়ে নীরব নিস্তব্ধ স্বামী সাদ নূর। স্ত্রীকে নিয়ে আর তার ঘোরা হবে না। সুখ-দুঃখ শেয়ার করা হবে না। যশোরের ওই ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় উত্তরা ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইডেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শোক জাননো হয়েছে। একই সঙ্গে শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।

এআইইউবির ছাত্র আবিরের মৃত্যুটা অন্যদের চেয়ে হৃদয়বিদারক : আনজির সিদ্দিকী আবির। পাটগ্রাম টিএন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন ঢাকার সেন্ট যোশেফ কলেজে। সেখানে থেকে এইচএসসি পাশ করার পর ভর্তি হন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (এআইইউবি)। বিবিএ শেষ করে যোগ দেন মিকা সিকিউরিটিজে। তারা এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা এপর্যন্তই। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বনানীতে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের ভেতরে ছিলেন আবির।

নিহতের চাচা ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তা ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, অগ্নিকাণ্ড শুরুর কিছুক্ষণ আগে আবির ওয়াশরুমে ঢুকেছিল। এসময় অগ্নিকান্ডের সময় সেখানে থাকা ১৯ কর্মীর সকলেই তাড়াহুড়ো করে অফিসের দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। ফলে সবার অজান্তেই ওয়াশরুমে থেকে যায় আবির। পরে তিনি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে অফিস ফাঁকা ও দরজাবন্ধ দেখে ফোন করে অফিসের একজনকে। তখন তিনি তাকে দরজা ভেঙ্গে বেরিয়ে উপরের দিকে চলে যেতে বলেন। একা একা দরজা ভাঙতেও সক্ষম হন আবির। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ধোঁয়ার কারণে উপরে যেতে না পেরে নিচের দিকে নামতে থাকেন আবির। শেষ পর্যন্ত ১৩ তলায় এসে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা যান তিনি। শুক্রবার বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

বনানীর আগুনে নিহত সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার সাউথইস্টের ছাত্র : রাজধানীর বনানীতে এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রাণ গেল এক ক্রিকেটারের। সম্ভবনাময় ওই ক্রিকেটার রাজধানীর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন। বাবার চাকরি সূত্রে থাকতেন মাগুরায়, স্টেডিয়াম ঘেষেই ছিলো বাসা। মাগুরার হয়ে খেলেছেন জেলা পর্যায়ে, বিভাগীয় পর্যায়ে খেলতেন নিয়মিতই। বাঁহাতি এই পেসার দলে লেফটি তুষার নামে পরিচিত ছিলেন। সতীর্থদের রাখতে হাসি-খুশিতে মাতিয়ে। টাঙ্গাইলে বসবাস তার পরিবারের। ক্রিকেটের পাশাপাশি চাকরি করতেন এফ আর টাওয়ারের এয়ার হেরিটেজ নামক বেসরকারি সংস্থায়। কাল অগ্নিকান্ডের সময় ছিলেন অফিসেই, ফিরেছেন লাশ হয়ে।

অকালেই না ফেরার দেশে মীম : অকালেই চলে গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মীম। তিনি ইতিহাস বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসিখুশি এই ছাত্রী টিউমারজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। খুলনা গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩০ মার্চ (শনিবার) তিনি মারা যান। মীমের বাসা বাসা ছিল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায়।

বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জসীম : বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জসীম উদ্দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই ছাত্রটি বন্ধুদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। কিছুদিন আগে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্বপ্ন ছিল একটা ভালো চাকরি করে পরিবারের দায়িত্ব নেবেন। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। সহপাঠীরা জানিয়েছে ২৮ মার্চ (বৃহস্পতিবার) রাতে লাইব্রেরি থেকে স্টাডি শেষ করে ১০ টায় মেসে যাওয়ার পর সাড়ে ১১টয়া নিজেই রান্না করে খেয়েছে জসীম। তারপর রাত ১টায় ব্যাংকের পরীক্ষা ছিল বলে একটু আগে ঘুমিয়েছে। কিন্তু রাত ৩টার সময় তাররুমমেটদের ঘুম ভাঙে জসিমের ছটফটানিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জসীমের মৃত্যু হয়েছে।

কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন বন্ধুসুলভ রিজভী : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনায়েদ রিজভী বন্ধুসুলভ ছিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জুনায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের হারাগাছে।
ইংরেজি বিভাগের সভাপতি প্রফেসর আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমি বিষয়টি শুনেছি। জুনায়েদ দীর্ঘদিন থেকে কিডনির সমস্যায় ভুগছিল। তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।

হঠাৎ বুকের ব্যথায় না ফেরার দেশে জামিউল : আত্মীয় স্বজনসহ বন্ধুদের সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জামিউল হাসান। হঠাৎ বুকের ব্যথায় আকস্মিক মৃতু হয়েছে তার। ৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জামিউল হাসান ইংরেজি বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী। তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামে ছেলে। সে নগরীর ভদ্রা এলাকার একটি মেসে থাকতেন। জামিউলের বন্ধু অনিক জানান, জামিউল সুস্থ্যই ছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় হঠাৎ বুকে ব্যথা ওঠে। এসময় তিনি গ্যাসের ব্যথা ভেবে ওষুধ খায়। কিন্তু বুকের ব্যথা না কমায় মেসের বন্ধুরা তাকে রামেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা, ০১ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।