দুর্ঘটনায় ১২ মাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ শিক্ষার্থী নিহত


Published: 2019-01-01 14:12:00 BdST, Updated: 2019-03-22 23:14:31 BdST

আশিকুর রহমান : এক বছরে দুর্ঘটনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সড়কে প্রাণ গেছে ছাত্রীসহ ৫ শিক্ষার্থীর। অগ্নিদগ্ধ হয়ে একই সঙ্গে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। অাম গাছ থেকে পড়ে নিহত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডারত অবস্থায় বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়ে নিহত হয়েছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পড়তে আসা এসব শিক্ষার্থী অকালে ঝরে যাওয়ায় শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না স্বজন ও সহপাঠীরা।

চম্পা মণ্ডল : বিদায়ী ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় পিকআপ চাপায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী চম্পা মণ্ডল নিহত হয়েছেন। চম্পা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তিনি খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার জালিয়াখালী গ্রামের ভুদেব মণ্ডলের মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ঘোনাপাড়া মোড়ে বাজার করতে গিয়েছিলেন চম্পা মন্ডল। কেনা-কাটা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মেসে ফেরার পথে রাস্তা পারাপারের সময় একটি দ্রুতগতির পিকআপ ভ্যান তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাকিবুল হক সৌরভ : সদ্য বিদায়ী বছরের ২০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। এসময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে অনুসন্ধান ভবনের চারতলায় ওই ছাত্র বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। নিহত ওই ছাত্রের নাম রাকিবুল হক সৌরভ বিজয়। আহত সারোয়ার আলম পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কনস্টেবল। বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে।

নিহত বিজয়ের বাড়ি নরসিংদী জেলার ভেলাব থানার ভাবলা গ্রামে। তিনি রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় থাকতেন। তার ছোট ভাই আজিজুল হক শুভ জানান, সৌরভ বিজয় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে লেখাপড়া করতেন।

জানা গেছে, বিজয় ঢাবির ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন।

বিজয়ের ছোট ভাই শুভ জানান, বিজয় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কনস্টেবলের বন্ধু। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়েছিলেন সৌরভ। সেখানে চারতলা ভবনের ছাদে উঠলে তিনি বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত্যু ঘোষণা করেন।

তাহিরা শশী : গত বছরের ১২ মার্চ নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তাহিরা শশী নিহত হয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী ছিলেন। তাহিরা শশী তার স্বামীকে নিয়ে নেপালে যাচ্ছিলেন ঘুরতে। ১২ মার্চ নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ৪ ক্রুসহ ৬৭ আরোহীবাহী বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

তৌহিদুল ইসলাম, মো. শাহীন মিয়া, মো. হাফিজুর রহমান এবং দীপ্ত সরকার : গত ২৪ মার্চ দিবাগত রাত ১টায় ময়মনসিংহের ভালুকায় মাস্টারবাড়ি এলাকায় একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এঘটনায় দগ্ধ হয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) চার মেধাবী শিক্ষার্থী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কুয়েটের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষবর্ষের চার শিক্ষার্থী গত ১০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত স্কয়ার গ্রুপের একটি টেক্সটাইল মিলে এক মাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টের (ইন্টার্ন) জন্য ময়মনসিংহের ভালুকার মাস্টারবাড়ি এলাকার একটি ৬তলা ভবনের ৩ তলায় থাকা শুরু করেন।

দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন মো. তৌহিদুল ইসলাম। গুরুতর দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ২৮ মার্চ রাতে মো. শাহীন মিয়া, পরদিন ২৯ মার্চ রাতে মো. হাফিজুর রহমান এবং ৩০ মার্চ সকালে দীপ্ত সরকারের মৃত্যু হয়।

ওমর তৌফিক : গত বছরের ৯ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ ওমর তৌফিক শখের বশে ক্যাম্পাসে আম পাড়তে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। রাত ১২টায় বন্ধুদের সঙ্গে ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের একটি আম গাছে আম পাড়তে ওঠেন তৌফিক। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায় শেখ ওমর তৌফিক। এতে গুরুতর আহত হন। পরে আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থা গুরুতর দেখে ঢামেক হাসপাতাল থেকে তাকে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়।

সোহবার আলি সজল : হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) দশম ব্যাচের ছাত্র সোহরাব আলি সজল প্রাণ হারিয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। গত বছরের ৩ মে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। ৮ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। রংপুর থেকে মোটরসাইকেলযোগে দিনাজপুর যাচ্ছিলেন সোহরাব আলি সজল। রংপুরের পাগলাপীরের কাছে তার মোটরসাইকেলের সাথে একটি ইজিবাইকের সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুরুতর আহত অবস্খায় তাকে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার বাড়ি রংপুরে।

কল্যাণ রায় চৌধুরী : গত বছরের ১৮ অক্টোবর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) মেধাবী ছাত্র কল্যাণ রায় চৌধুরী মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কল্যাণ রায় চৌধুরী পূজা দেখে মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। মহাসড়কে এসে মোটরসাইকেলে ব্রেক কষলে তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। কল্যাণ রায় চৌধুরী বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট থানার বেতাকা মোমতলা গ্রামের মহানন্দ রায় চৌধুরীর ছেলে।

শাহরিয়ার সৌরভ সেজান : গত বছরের ১ জুলাই রাজধানীর বসুমতি পরিবহনের একটি বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরিয়ার সৌরভ সেজান। ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ওভারব্রিজের কালশি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শাহরিয়ার সৌরভ সেজান বেসরকারি এনজিও ব্র্যাকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত স্কুল ‘টিচ ফর বাংলাদেশ’ নামে একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো হ- ৫৫-০৫৯০) নিয়ে কালশি ওভারব্রিজ এলাকা পৌঁছলে বসুমতি পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তাকে চাপা দিয়ে চলে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মাহমুদ বিন আশরাফ : গত বছরের ২৬ অক্টোবর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন জাহাহীঙ্গরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহমুদ বিন আশরাফ। হঠাৎ ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণে নির্মাণাধীন ভবন থেকে লোহার পাইপ মাথায় পড়ে নিহত হয়েছেন তিনি। রাজধানীর ধানমন্ডিতে ওই ঘটনা ঘটে। নিহত ওই ছাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করতেন। একই দুর্ঘটনায় ইখতেদার ইভান (২২) নামে অপর এক ছাত্র আহত হয়েছেন। আহত ইভান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র।
নিহত মাহমুদ মেহেরপুরের আশরাফুল আলমের ছেলে।

মাহমুদুল হাসান : গত বছরের ৬ নভেম্বর রিকশা থেকে পড়ে না ফেরার চলে গেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ছাত্র মাহমুদুল হাসান। তিনি বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের ২০১৬-১৭ সেশনের ছাত্র ছিলেন। চবির শিক্ষক ক্লাবের সামনের রাস্তায় রিক্সা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। তার মাথায় আঘাত লাগলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকা, ০১ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।