চাকরির জন্য ১০ মাসে প্রাণ দিল শিক্ষকসহ ৪ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র!


Published: 2018-12-28 15:04:53 BdST, Updated: 2019-01-19 19:27:00 BdST

ইফতেখার মাহমুদ : চাকরির জন্য গত ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ৩ ছাত্র প্রাণ দিয়েছেন। গত মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তারা বেছে নিয়েছেন এমন ভয়ংকর পথ। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। চলে যাওয়ার আগে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে গেছেন তারা। এদের মধ্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার স্বপ্ন ছিল তার। ১৫ লাখ টাকা ঘুষের জন্য তার চাকরি হয়নি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রও চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া আত্মহত্যার ভয়ংকর পথ বেছে নেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আত্মহত্যার অাগে চাকরি নিয়ে হতাশ থাকতেন তারা। এনিয়ে আত্মহত্যার আগে ফেইসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।

দেবাশীস মণ্ডল : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবাশীস মণ্ডলের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার গল্পটা নির্মম। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) পড়াশোনা করেছেন দেবাশীস মণ্ডল। মৃত্তিকাবিজ্ঞানের ওই ছাত্রের স্বপ্ন ছিল পবিপ্রবির শিক্ষক হবেন। সেভাবেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। অনার্স ও মাস্টার্সে তিনি ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। মাঝখানে কিছুদিনের জন্য তিনি কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। এরই মাঝে পবিপ্রবির মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষের দিকে অদৃশ্য সুতার টানে সব আটকে যায়। চাকরি না হওয়ার কথা জানতে পেরে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এই মেধাবী ছাত্র ১৪ মে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তাকে শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতার পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দেবাশীস মণ্ডলের ছোটভাই আশিস কুমার বলেন, ভাই পরীক্ষা দিয়ে এসে বাড়িতে ফোন দিয়ে ১০ লাখ টাকা চান। বাকি ৫ লাখ তিনি নিজে দেবেন বলেও আমাদের জানান। আমরা ১০ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলাম, কিন্তু এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে গেল। ভাই জানতে পারেন, কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজির চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। এ চাপ তিনি মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে আমার ভাই।

এর আগে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পর নানা ধাপ পেরিয়ে ১২ মে দেবাশীস ভাইভায় অংশ নেন। এর দুই দিন পরেই তিনি আত্মহত্যা করেন।

জানা গেছে, পবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২৪ এপ্রিল। এতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার পদে চাকরি প্রার্থী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ দেন ৬ জন। এর মধ্যে দেবাশীস মণ্ডল সব যোগ্যতায় এগিয়ে ছিলেন। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছিল।

দেবাশীসের সহকর্মী একই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের শিক্ষক আবদুল মান্নান বলেন, দেবাশীষ তার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা দিয়ে কুষ্টিয়ায় এসে খুব চিন্তিত ছিলেন। ঘটনার দিন সকাল থেকে ফোনে কারও সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছিলেন। এ সময় তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। আমরা বারবার তাকে জিজ্ঞাস করেও কোনো উত্তর পাইনি। দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে তিনি অফিস ত্যাগ করে বাসায় ফেরেন। কিছুক্ষণ পর আমি ও অন্য আরেক রুমমেটও বাসায় যাই। গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেতর থেকে আটকানো। অনেক ধাক্কাধাক্কি করে কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা বাড়িওয়ালাকে খবর দিই। পাশের বাসার ৩য় তলার সানশেড থেকে উঁকি দিয়ে তাকে বসা দেখতে পেয়ে দরজা খুলতে অনুরোধ করি। তিনি খুলবেন বললেও আর খুলেননি। একপর্যায়ে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখি। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

দেবাশীষের বাবা পরিমল মণ্ডল জানান, চাকরি না দিয়ে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলল। টাকা ১০ লাখতো ব্যাংকেই ছিল। আমার ছেলেটা ফার্স্ট হয়েও শিক্ষক হতে পারলো না।

তানভীর রহমান : চলতি বছরের ৩১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন তানভীর রহমান। সরকারি চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে ওই পথ বেছে নিয়েছেন বলে মনে করেন তার স্বজনরা। তানভীরের খালা মেহেরুননেসা রোববার বলেন, চার বছর ধরে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করছিল তানভীর। চাকরির পরীক্ষা দিয়ে এসে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কথা বলত; চাকরি পেতে টাকা লাগে- এমন হতাশার কথা বলত। শুনে আমরা সবাই কষ্ট পেতাম।

চাকরির বাজারের এমন পরিস্থিতি এখন ‘সবারই জানা’- এমন মন্তব্য করে মেহেরুননেসা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও সরকারি চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে ও আত্মহত্যা করল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফসিউর রহমান ও কামরুন্নেসার ছেলে তানভীর বড় হয়েছেন ঢাকার শেওড়াপাড়ায় নানাবাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে। ২০০৫ সালে বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ করেন।

পরে ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগে সান্ধ্যকালীন এমবিএ কোর্সে ভর্তি হন তিনি।

মেহেরুন নেসা জানান, কিছুদিন আগে বিমানে চাকরি হয়েছিল তানভীরের। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ওই নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এক বন্ধুর গার্মেন্টে মার্চেন্টাজার হিসেবে কাজ শুরু করেছিল তানভীর। কিন্ত ওই কাজে সে খুশি ছিল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ ভবনের নয়তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান আত্মহত্যা করেন ৩১ মার্চ। তার সহপাঠীদের বক্তব্য, তানভীর সরকারি চাকরি না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছিলেন।

সৈকত মণ্ডল : চাকরি না পেয়ে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ভয়ংকর পথ বেছে নিয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৈকত মণ্ডল। খুলনার একটি মেস থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। হতাশা থেকেই সুইসাইড নোট লিখে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন সৈকত রঞ্জন মন্ডল। তিনি ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজির ছাত্র ছিলেন।

সৈকতের রুম থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়রির একটি পাতায় লেখা রয়েছে- ‘অনেক স্বপ্ন ছিলো চাকরি করবো। মার মুখে হাসি ফুটাবো। কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে গেল। মার শরীর খুব খারাপ। তবুও আমি খুলনা থেকে পড়ার কথা ভাবছি। বাড়িতে যেতে গেলে সবকিছু নিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া আর কোনো উপায় নেই। না আছে টিউশনি যার উপর নির্ভর করে খুলনাতে চলতেছিলাম। কোনো চাকরিতেও ভয় পাচ্ছি। আজ এতো কঠিন অবস্থা তৈরি হয়ে গেল। আমি শুধু বন্ধুদের কে কি করছে সেই দিকে খেয়াল করে চলছি। আমরা এক মেসে চার বন্ধু থাকতাম। এর মধ্যে আমার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে। অন্য তিনজন চাকরি পেয়েছে। আসলে প্রত্যেকটি কাজ করতে করতে সেটা ছেড়ে দিয়ে BCS’র দিকে যাওয়ায় হঠাৎ চাপ বেড়ে যায়। সে জন্য আমি আরও Abnormal Behaviour প্রদর্শন করছি। প্রজেক্টের কাজে চাপ থাকায় শরীরটা গড়তে পারিনি। সে জন্য অতিরিক্ত চাপ সহ্য হয়নি।’’

তার ডায়রির লেখা থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই বছর আগে পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করলেও চাকরি না পাওয়ায় হতাশার কারণেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

অাজিমুদ্দিন : চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর চাকরির জন্য ভয়ংকর পথে হাঁটেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র আজিমুদ্দিন। বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্র ১ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে চলে গেছেন। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করলেও ভালো চাকরি না পেয়ে তিনি এমন বোকামি করেছেন। তিনি মসজিদে ইমামতি করেছেন। তবে হতাশার মাঝেই ভয়ংকর পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি। তিনি ঝিনাইদহের মহিষাকুন্ডু গ্রামের আব্দুল হান্নান মহুরির ছেলে।

সহপাঠীরা জানান, আজিমুদ্দিন নম্র ও ভদ্র স্বভাবের ছিল। তবে সে চাকরি নিয়ে বেশ টেনশনে ছিল। যেখানেই ভাইভা দিয়েছে তার কাছে কোন না কোনভাবে টাকা চাওয়া হয়েছে। তবে সে এভাবে চলে যাবে এটা তারা মেনে নিতে পারছেন না।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর মহিউদ্দিন জানান, শুনেছি চাকরি না পেয়ে আজিমুদ্দিন আত্মহত্যা করেছে। ছেলেটি খুব নম্র ভদ্র হিসেবে এলাকায় পরিচিত। বেশে কিছুদিন তিনি পঞ্চগ্রাম জামে মসজিদে তিনি ইমামতিও করেছেন বলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন।

আজিমুদ্দিনের দাদা আব্দুল মালেক জানান, চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগতে থাকেন আজিমুদ্দিন। এক পর্যায়ে বৃহস্পতিবার তিনি বিষপান করেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শনিবার আজিমুদ্দিন মারা যায়। তিনি আরও জানান, আল-কোরআন থেকে অনার্স মাষ্টার্স পাস করার পর আজিমুদ্দিন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করেন। কিন্তু কোন জায়গায় টাকা ছাড়া তার চাকরি হয়নি।

[বি:দ্র : চাকরির জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এমন বোকামি আমরা আর দেখতে চাই না। বেঁচে থেকেই জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে হয়। এভাবে নিজেকে আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে কোন সমাধান আসে না।]

ঢাকা, ২৮ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।