শিক্ষার্থী বিমুখ ইবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী


Published: 2018-09-24 14:18:58 BdST, Updated: 2018-12-11 13:24:12 BdST

রায়হান মাহবুব: নানা অনিয়ম ও প্রতিবন্ধকতার কারণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) খাদেমুল হারামাই বাদশাহ ফাহাদ বিন আব্দুল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী থেকে শিক্ষার্থী বিমুখ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কিংবা জব সংক্রান্ত বই-পুস্তক নিয়ে লাইব্রেরীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা সহ নানা কারণেই লাইব্রেরীটির এই বেহাল দশা।

পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কার্ড বিহীন প্রবেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, বই ইস্যুতে নিয়ম না থাকা, নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হওয়া, লাইব্রেরীতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাসীনতা ও শিক্ষার্থীদের সাথে অসদাচরণ সহ নানা সমস্যা ও অনিয়মে জড়িত বর্তমান এ লাইব্রেরী।

জানা যায়, ১৯৯৫ সালে ‘খাদেমুল হারামাইন বাদশাহ ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার’ নামে এই আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক লাইব্রেরীটি নির্মিত হয়। যদিও এর প্রতিষ্ঠাকাল ছিল ১৯৮৪-৮৫ সাল।

গ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, ৮৫ হাজার বর্গমিটার জুড়ে বিশাল এলাকায় বিস্তৃত ৪ তলা বিশিষ্ঠ এ লাইব্রেরীতে মোট ১ লক্ষ ৪ হাজার ৫ শত ৭৪ টি গ্রন্থ স্থান পেয়েছে। যেখানে ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্ণারে’ ৫ শতাধিক মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গ্রন্থ, ‘একুশে কর্ণারে ৭২ টি এবং ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণারে’ ৩৩১ টি বঙ্গবন্ধু ও তার জীবনাদর্শ সম্পর্কিত গ্রন্থ সমূহ স্থান পেয়েছে। এছাড়া ১৮ হাজার ৯ শত ৫৫ টি সাময়িকী ও জার্নাল এ লাইব্রেরীতে স্থান পেয়েছে।

জানা যায়, ৪ তলা বিশিষ্ট এ লাইব্রেরীর নিচ তলায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযোদ্ধ ও একুশে কর্ণার, দেশী-বিদেশী সাময়িকী ও জার্নালের সংগ্রহশালা। যেখানে প্রতিদিন ২২ টি জাতীয় পত্রিকা শিক্ষার্থীদের পড়ার সুবিধার্থে সরবরাহ করা হয়।

দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আরবী সাহিত্য, আল-কুরআন, আল-হাদিস ও আল-ফিকহ বিভাগের গ্রন্থ। তৃতীয় তলায় রয়েছে আইন, ইংরেজি, ইসলামের ইতিহাস, অর্থনীতি ও লোক-প্রশাসন বিভাগের গ্রন্থ এবং চতুর্থ তলায় ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদভুক্ত বিভাগ সমূহের ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষভুক্ত বিভাগসমূহের গ্রন্থ।

এসব গ্রন্থ সমূহ ইউজিসি কর্তৃক নির্ধারিত বাজেটে স্ব-স্ব বিভাগসমূহ তাদের সেমিনার লাইব্রেরীর জন্য এক কপি এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর জন্য এক কপি বই ক্রয় করে থাকেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী কোন বই ক্রয় করেন না বলে জানা যায়।

অপরদিকে চতুর্থ তলার পশ্চিম পাশে রয়েছে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক বিষয়ে সার্বিক তদারকি করা হয়। এছাড়া রয়েছে আধুনিক ওয়াইফাই সমৃদ্ধ ইন্টারনেট ব্যবস্থা। তার পরেও কেন শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরী বিমুখ?

বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাডেমিক-প্রশাসনিক সহ সার্বিক দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরন করছে। আমরা ঢাবির ১২ শত আসন বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে দেখি সকাল হতেই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। চেয়ার ধরার জন্য তাদের লম্বা লাইন পড়ে যায়।

ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী শুক্রবার বিকাল তিনটা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা এবং শনিবার (অফ ডে) সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। সেখানে বই ইস্যুর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কার্ড প্রদর্শন করতে হয়।

কিন্তু ইবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত যাওয়া-আসা করে। শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরী বিমুখতার প্রধান কারন হচ্ছে কার্ড বিহীন কোন শিক্ষার্থীকে লাইব্রেরীতে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং একাডেমিক কিংবা জব সংক্রান্ত বই-পুস্তক নিয়ে লাইব্রেরীতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা ও বই ইস্যুর ক্ষেত্রে কোন নিয়ম না থাকা।

আইসিই বিভাগের শিক্ষার্থী মাহদী হাসান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী রাত ১০ টা পর্যন্ত খোলা থাকে কিন্তু আমাদের লাইব্রেরীম্যানেরা সন্ধ্যা ৭ টার আগেই তড়িঘড়ি লাগিয়ে দেয়। আমাদের বাইরের জর সংক্রান্ত কোন বই নিয়ে লাইব্রেরীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি বই ইস্যু করতে হলেও লাইব্রেরী স্টাফদের ধকলে পড়তে হয়। বৃহস্পতিবার-শুক্রবারও লাইব্রেরী খোলা দেখতে চাই। কারন এই দুই দিন অবসরে কেটে যায়।

ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মাহি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমাদের বিভাগ নতুন হওয়ায় লাইব্রেরীতে আমাদের বিভাগের কোন বই পায় না। আবার শিক্ষার্থীদের আড্ডাবাজী আর উ”চস্বরের আওয়াজে পড়ায় মন বসেনা। এছাড়া লাইব্রেরীতে দ্বায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বায়িত্বে অবহেলারও অভিযোগ করলেন মাহি।

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাজেদা আক্তার জলি ক্যাম্পাসলাইভকে বললেন অন্য কথা, বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের বর্তমান তরুণ সমাজকে বই থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যার কারণে এখন লাইব্রেরী পাঠক শূন্য।

খাদেমুল হারামাই বাদশাহ ফাহাদ বিন আব্দুল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী

 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরীর দ্বিতীয় তলার পূর্ব পাশে পড়ে রয়েছে ময়লার আবরণযুক্ত ডেস্ক। আবার পুরাতন বইগুলো ময়লাযুক্ত অবস্থায় এলোমেলোভাবে যেখানে সেখানে পড়ে আছে। লাইব্রেরীর বিভিন্ন তলার কোন কোন স্থান অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতায় পড়ে আছে। পুরুষ ও মহিলা টয়লেটগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। দিন দিন হারাচ্ছে লাইব্রেরী তার নান্দনিকতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়সারা কাজ করতে দেখেছি। জবাবদিহিতার কোন মাথাব্যথা নেই তাদের।

সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) মো: আতাউর রহমান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমরা ইতো: মধ্যে ওপেন সেল্ফ করেছি। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যে কোন বই বুক সেলফ থেকে পড়তে পারবে। আমরা অতি শীঘ্রই শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা একটি রুমের ব্যবস্থা করবো যেখানে তারা বাইরের বই নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। এছাড়া বৃহস্পতিবার লাইব্রেরী খোলা রাখার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহিত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, লাইব্রেরী মুখি শিক্ষার্থীরা অতি শীঘ্রই দুটি সমস্যার সমাধান দেখতে পাবে। তার একটি হলো বই নিয়ে প্রবেশ সংক্রান্ত সমস্যা, আর অন্যটি হলো দুই দিন বন্ধের বিষয় সংক্রান্ত সমস্যা। এছাড়া বাড়িতে বই ইস্যুর যে পর্যাপ্ততা, সেটা আমাদের না থাকায় এব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছিনা।

 

 

ঢাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।