নানা সমস্যায় জর্জরিত ইবির সাদ্দাম হোসেন হল, দেখার কেউ নেই


Published: 2018-09-09 22:30:40 BdST, Updated: 2018-09-19 04:14:21 BdST

রায়হান মাহবুব, ইবি: খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে পুরানো একটি হল। যেন দেখার কেউ নেই। বাজেট আসে বাজেট যায় কিন্তু ভাগ্যের উন্নয়ন হয়না ওই হলের। হলের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন হর হামেশাই। কর্তৃপক্ষকে বললে তারাও আমলে নেন না। শুনেও যেন না শুনার ভান করেন। বলছি নানান সমস্যায় জর্জরিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন আবাসিক হল সাদ্দাম হোসেন হলের ব্যাপারে।

যুগের পর যুগ পার হলেও হলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কারকল্পে প্রশাসনের নেই কোনো মাথা ব্যথা। প্রতিষ্ঠার তিন যুগ পার হলেও দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি । হলের নিম্ন মানের খাবার, পানি, ওয়াইফাই, নিয়মিত চুনকাম না করা, পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের অভাব, ছাদ থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে পানি পড়া, হল লাইব্রেরীর বেহাল দশা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিষ্কার শৌচাগারসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত বর্তমানে এ হল।

জানা যায়, ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সময়কালে ১৯৮২ সালে এ হলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। এসময় ইরাকি সরকার এ হলের অর্থায়নে আর্থিক সহযোগিতা করেন বিধায় এ হলের নামকরণ করা হয় সাদ্দাম হোসেন হল। তৎকালীন সময়ে হলের কাজ চতুর্থ তলা পর্যন্ত উঠে পরে কাজ থমকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথম কোন আবাসিক হল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে এ হলের। বর্তমানে এ হলে ৪৫০ জন শিক্ষার্থীর থাকার সুবিধা রয়েছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অত্র হলের ছাত্রদের প্রধান সমস্যা পানি সমস্যা। তীব্র পানি সংকট থাকায় তাদের সময়মতো গোসল, কাপড় কাঁচা ও রান্না-বান্না করে খেতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। পানি না পেয়ে অনেক সময় ছাত্রদের খাওয়া-গোসল বাদ দিয়েই তাদের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে হয়। এ বিষয়ে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নূর হোসেন বলেন, বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে আমাদের হলের প্রধান সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। গোসলে তো পানি পাইনা, এমনকি শৌচাগারের সময়ও পানি পাওয়া যায় না।

হলের আরেক সমস্যা ডাইনিংয়ে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন, ভালো মানের রান্না ঘরের ব্যবস্থা না থাকা, ডাইনিংয়ের কর্মচারীদের নোংরা হাতে খাবার পরিবেশন, হল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হঠাৎ মিল রেট বাড়ানো, স্থায়ী ম্যানেজার না থাকা, ডাইনিং নিয়মিত পরিস্কার না রাখাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এ হলের ডাইনিং। এ বিষয়ে হলের ডাইনিং ম্যানেজার আবেদ আলী বলেন, হল কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত ভর্তুকী না দেওয়া ও ক্ষমতাসীন কিছু ছাত্রদের ফাও খাওয়ার কারনে বাজার করতে হিমশিম খেতে হয়। এ কারনে বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে ভালো মানের খাবারের রেট বাড়াতে হয়।

বৃষ্টির সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় হলের ফাটল ধরা ছাদ দিয়ে চুঁয়ে চুঁয়ে পানি পড়তে দেখা যায়। ফলে বৃষ্টি হলেই হলের বিভিন্ন স্থান বারান্দা পানিতে ভরে যায়। এমনকি রুমের মধ্যেও পানি ঢুকে পড়তে দেখা যায়। হলের আরেক প্রধান সমস্যা শৌচাগারের সমস্যা। নিয়মিত শৌচাগার-বেসিন পরিস্কার না করার ফলে বেসিনে ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা হতে উৎকট দূর্গন্ধ ছড়ায় হলের রুমগুলোতে।

এবিষয়ে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সোহেল রানা ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, এ বর্তমান সময়েও আমাদের হলে টাইলস সমৃদ্ধ উন্নতমানের টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়নি। সেই পুরোনো আমলের শৌচাগার দিয়ে চলছে টয়লেটের কাজ। সর্বশেষ ২০১৫ সালে হলের করিডোরগুলোতে চুনকাম করা হলেও দীর্ঘ বছর যাবত রুমের অভ্যন্তরে ও হলের বাইরের দেওয়ালে কোন চুনকাম করা হয়নি।

সাথে সাথে রুমের দরজা ও জানালার গ্রীলসমূহেও দীর্ঘকাল রং করা হয়নি। ফলে একদিকে রুমের অভ্যন্তরে ও বাইরের দেওয়ালের প্লাস্টার পড়ছে খসে, অন্যদিকে মরীচিকা পড়ে নষ্ট হচ্ছে জানালার গ্রীলসমূহ। এতে করে হলের আভ্যন্তরিন ও বাহ্যিক সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবাসিক শিক্ষার্থী মুমিন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, দূর থেকে হলটিকে দেখলে কেমন যেন বস্তি বস্তি মনে হয়। তবুও হল প্রশাসনের কোন মাথা ব্যথা নেই।

এদিকে হলের সম্মুখে (ফুল বাগানে) রাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগত প্রভোস্ট প্রফেসর ড. আশরাফুল আলম সোডিয়াম লাইটের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু ঈদের ছুটির পর লাইটগুলোর কোন হদিছ মিলছে না। এব্যাপারে জানতে চাইলে হল প্রভোস্ট প্রফেসর ড. আতিকুর রহমান ক্যাম্পাসলাইভকে কোন উত্তর দিতে পারেন নি।

বছরে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ইন্টারনেট চার্র্জ প্রদান করলেও হলের ওয়াইফাই ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ওয়াইফায়ের কচ্ছপ গতির কারনে সময়মতো হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা তা ব্যবহার করতে পারে না। হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহেদ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ওয়াইফাই ঠিকমতো না পাওয়ার কারনে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ডাউনলোড করতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। মাঝেমধ্যে ধৌর্যহারা হয়ে পড়ি।

হলের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা গেল দুটি একটি ময়লামাখা বই বুকসেলফে পড়ে আছে। সেগুলো কেউ ছুঁয়েও দেখে না। হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী তাওফিক লাইব্রেরি সম্পর্কে ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমরা শুধু সেখানে একাডেমিক পড়াশুনার জন্য যাই, কিন্তু লাইব্রেরিতে কোন বই না থাকাই তা পড়া হয় না। যা আছে তা অনেক পুরোনো।

হলের এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে আবাসিক শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন নীলের নের্তৃত্বে সর্বশেষ গত জুলাই মাসে শিক্ষার্থীরা প্রায় আড়াই ঘন্টা যাবৎ তালা ঝুলিয়ে রাখে প্রভোস্টের রুম। যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও হল কর্মকর্তাদের কাজে ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

আবাসিক একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, হলের ভিতরের বাগান অপরিষ্কার ও পাশে ঝোঁপঝাড় থাকায় সম্প্রতি হলের ভিতরে বিষাক্ত সাপের উপদ্রোব বেড়েছে। ফলে জীবন ঝুকিতে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।

এছাড়াও হলের করিডোরের লাইট নষ্ট থাকায় রাতে অন্ধকারে চলাচল করতে হয় তাদের। এমন বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে প্রভোস্টের নিকট বারবার লিখিত অভিযোগ করলেও তিনি কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ করেন তারা।

এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় হলে প্রভোস্টের উপস্থিত কম থাকার কারণে সমস্যা বেড়েই চলেছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। তারা আরো জানান বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে হল কর্মকর্তাদের নিকট গেলে হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের।

হলের নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমরা হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সাথে হল সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিনিময় করেছি। হলের খুঁটিনাটি সমস্যাগুলো সমাধানের দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। এছাড়া বড় বড় সমস্যাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। প্রশাসন এব্যাপারে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করবে বলে জানিয়েছেন।

সদ্য একনেক কর্তৃৃক অনুমোদনপ্রাপ্ত ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে সাদ্দাম হোসেন হলের কোন বরাদ্দ আছে কিনা জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম আলী হাসান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, সরকার পূর্ণসংস্কার ও সঞ্চালনার জন্য কোন বরাদ্দ দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। একারনে ঐ হলের জন্য কোন ব্যয় বরাদ্দ নেই।

এদিকে হলের আবাসিক শিক্ষকরাও তেমন খোঁজ-খবর নিতে হলে আসে না বলে অভিযোগ করেন একাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী। কোন দরকারী কাজে তাদের হলে নিয়মিত না পাওয়ায় বিভাগে গিয়ে দরকারী কাজ সেরে নিতে হয় বলে আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান। এ বিষয়ে হলের আবাসিক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক এস.এম শোয়েব ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমি হলের সমস্যার কথা শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্টের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে হলের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করবো।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. সেলিম তোহা ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, সম্প্রতি আমি হলটি পরিদর্শন করেছি। হলের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের অগ্রগতি শিক্ষার্থীরা খুব শীঘ্রই দেখতে পাবে।


ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।