কোটা সংস্কারে সক্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের গুরুদণ্ড!


Published: 2018-04-28 12:10:06 BdST, Updated: 2018-10-20 08:51:28 BdST

আহসান যোবায়ের : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ইংরেজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমদকে লঘু পা‌পে গুরুদণ্ড দেয়া হ‌য়ে‌ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশনা জা‌লিয়া‌তির কথিত অ‌ভি‌যো‌গে তা‌কে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। অথচ তার ওই লেখা প্রকাশই করা হয়নি। এমনকি যাচাই বাছাইয়ের মধ্যেও আসেনি। অভিযোগ উঠেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় থাকাই তার জন্য কাল হয়েছে। ওই আন্দোলনের সময় তিনি আহত হয়েছিলেন। এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।

জানা গেছে, তপ্রকাশনা জালিয়াতির অভিযোগ এ‌নে গত বৃস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭তম সিন্ডিকেটে নাসির উদ্দিন নামে ওই শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এটাকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে চাকুরিচ্যুত করার অভিযোগ তুলে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদে কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে তারা। শাস্তি প্রত্যাহারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আগামী রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ঘোষনা দেন তারা।

একই অ‌ভি‌যো‌গে বাংলা বিভা‌গের হোস‌নে অারা জ‌লি‌কে শা‌স্তি হি‌সে‌বে প‌দোন্ন‌তি অাট‌কে দেয়া হ‌য়ে‌ছি‌ল। তার অ‌ভি‌যোগ অা‌রো গুরুতর ছি‌লে। ঢা‌বি শিক্ষক সা‌মিয়া রহমা‌নের জা‌লিয়া‌তির বিষয়টা দে‌শে ব্যাপকভা‌বে অা‌লো‌চিত হয়। এখন পর্যন্ত চাকু‌রিচ্যুত করা হয়‌নি। অার না‌সির উ‌দ্দিন অাহ‌মেদ প্রকা‌শের জন্য যে লেখা জমা দি‌য়ে‌ছি‌লেন অাবার প‌রে ত‌া প্রত্যাহারও ক‌রে‌ছেন। ওই লেখা প্রকাশই হয়‌নি। যাচাই বাছাই‌য়ের ম‌ধ্যেও অা‌সে‌নি। এরপরও তা‌কে গুরুদণ্ড দেয়া হ‌য়ে‌ছে। এজন্য তা‌কে স্বপ‌দে ফেরা‌নোর জোরা‌লো দা‌বি উ‌ঠে‌ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ, তিনি চীন থেকে প্রকাশিত একটি লেখা হুবহু কপি করেছেন এবং যা ভিক্টোরিয়া ইউনির্ভাসিটিতে প্রকাশের জন্য গৃহিত হয়। তবে ওই শিক্ষক দাবি করেন তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। কেননা ভিক্টোরিয়া ইউনিভর্সিটি থেকে তার কোনো লেখাই প্রকাশিত হয়নি। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সমর্থনে অবস্থান নেওয়ায় ভিসির রোষানলে পড়েছেন তিনি। এসব কারণেই মিথ্যা অভিযোগ এনে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে বলে দাবি ওই শিক্ষকের। এর চেয়েও গুরুতর অভিযোগেও ঠুনকো শাস্তির উদাহরণও রয়েছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নাসির উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে যে প্রকাশনা জালিয়াতির অভিযোগে তাকে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে সে লেখাটি তার নামে এখন পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ হয়নি। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে যৌথ একটা ইংরেজি বিভাগের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আকরামুজ্জামানের সঙ্গে জমা দেয়া হয়েছিলো। সেটা অবশ্য নাসির উদ্দিন আহমদের একক নামে জমা দেন এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আকরামুজ্জামান। যা ভুল করে জামা দিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন আকরামুজ্জামান। এ সংক্রান্ত স্বীকারোক্তি সম্বলিত একটি অডিও এ প্রতিবেদকের কাছে রযেছে।

আকরামুজ্জামান এবং নাসির উদ্দিন আহমদের যৌথ ওই লেখা নিয়ে অভিযোগ উঠায় যাচাই বাছাইয়ের আগেই নাসির উদ্দিন আহমেদ লেখাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে প্রকাশনা জালিয়াতির অভিযোগের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। ২ অক্টোবর তিনি নোটিশের জবাব দেন তিনি। এর আগেই তিনি ভিক্টোরিয়া কর্তৃপক্ষকে তার লেখা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন। তার আবেদনের পেক্ষিতে ১৩ জুলাই ২০১৭ ভিক্টোরিয়া কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাহারও করে। অর্থাৎ যে লেখাটি নিয়ে নাসির উদ্দিন আহমদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এমন লেখার কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপরও তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে।

এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেইসবুকে) ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। চাকুরিচ্যুতের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘স্ট্যান্ড ফর নাসির স্যার’ নামে একটি ফেইসবুকে গ্রুপ খোলা হয়েছে। সেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী জয়েন করেছেন এবং বিভিন্ন লেখা পোস্ট করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

তাদের দাবি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলনে নাসির উদ্দিন আহমদের অংশগ্রহনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে ষড়যন্ত্রমূলক ফাঁসিয়েছেন। নাসির উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহারের দাবি জানান তারা। এদিকে শাস্তি প্রত্যাহারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আগামী রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ঘোষনা দিয়েছেন তারা।
সহকর্মীকে চাকরিচ্যুত করায় ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষকরাও। তবে সরাসরি বা সামনে এসে ক্ষোভ প্রকাশ কেউ করেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের সকল যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন নাসির উদ্দিন আহমেদ। বারবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থানের কারণে প্রশাসন বিপাকে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকা সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল কাজী ফিরোজ রশিদকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ভিসি। কিন্তু শিক্ষার্থীবান্ধব এই শিক্ষকের জন্য পারেননি। ভিসির বিরাগভাজন হওয়ার কারণে তাকে এতো বড় শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন তারা। বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলার অপরাগতা প্রকাশ করেছেন সবাই।

প্রকাশনা ও গবেষনা জালিয়াতির অভিযোগ এর আগে একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে উঠেছে। এর চেয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তার বিরুদ্ধে এতো বড় শাস্তিকে ব্যাক্তিগত আক্রোশের বহি: প্রকাশ হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
জানা যায়, ২০০৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে ২৭/৪ ধারা নামে একটি কালো আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ইংরেজি বিভাগের এ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পক্ষে সমর্থন জানান।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হল উদ্ধার আন্দোলনে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের সময় ওই শিক্ষক রাবার বুলেট এবং টিয়ারগ্যাসে গুরুতর আহত হন। তার শরীরে ৫৪ টি রাবার বুলেটের স্প্লিন্টার লাগে। যার মধ্যে এখনও ৪৩টি স্প্লিন্টার তার শরীর থেকে বের করা হয়নি। ২০১৬ সালের হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এবং সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনে নাসির উদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে মানববন্ধন, মিছিল ও সমাবেশে অংশগ্রহন করেন। শিক্ষার্থীবান্ধব এ শিক্ষকের চাকুরিচ্যুত করায় শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। স্বপদে বহালের জন্য আন্দোলনে যাচ্ছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক সিন্ডিকেটের এক সদস্য বলেন, এ ধরনের লেখা কপি পেস্ট অনেক শিক্ষকেরই আছে। এ ধরনের ঘটনায় এর আগে এমন শাস্তি কাউকে দেয়া হয়নি। তবে অধিকাংশ সিন্ডিকেট সদস্যই তার বিরুদ্ধে শাস্তির জন্য মতামত দিয়েছেন। এ নিয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। সিন্ডিকেটের অপর একজন সদস্যের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জবি ভিসি প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান বলেন, অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়ায় সিন্ডিকেট সভা ওই শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অভিযুক্ত শিক্ষক এসোসিয়েট প্রফেসর নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, যে অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটি মিথ্যা। আমার নামে একটা লেখা আমার বিভাগের একজন শিক্ষক জমা দিয়েছিলেন। সেটি প্রকাশিত হওয়ার আগে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে এ বিষয়ে জানানোর আগেই এটি আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। যে লেখাটি প্রকাশিত হয়নি সে লেখাকে ভিত্তি করে এত বড় সিদ্ধান্ত কোন ভাবে গ্রহণযোগ্য না। এ বিষয় নিয়ে তিনি আদালতে যাবেন বলে উল্লেখ করেছেন।

ঢাকা, ২৮ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।