এনএসইউ'তে করোনার টিকা বিষয়ক জরিপের ফলাফল


Published: 2021-01-24 15:31:18 BdST, Updated: 2021-02-25 07:51:44 BdST

এনএসইউ লাইভঃ বাংলাদেশ অক্সফোর্ড উদ্ভাবিত এস্ত্রাজেঙ্কা ভ্যাক্সিন হাতে পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ইন্ডিয়া থেকে ভ্যাক্সিনটি ক্রয় করার সব রকম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে বর্তমানে এটি সর্বস্তরের জনগণের মাঝে প্রয়োগের পরিকল্পনা চলছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে বড় পরিসরে ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বাধা গুলি চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সেইসাথে কোন জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রথম ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করা হবে এবং কি প্রক্রিয়ায় এটি বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌছানো হবে তা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্যাক্সিন প্রয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো গঠনে সহায়ককারী তথ্য উদ্ভাবনের লক্ষ্যে সাম্প্রতিককালে একটি গবেষণা জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউট, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১৮ এর বেশী বয়সী নাগরিকদের মাঝে এ জরিপটি চালানো হয়। এ গবেষণায় সহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও যুক্ত ছিলেন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার(সি আই পি আর বি), রংপুর হাইপারটেনশন রিসার্চ সেন্টার ( এইচ & আরসি-রংপুর)এবং ইউনিভারসিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।

১২ ডিসেম্বর ২০২০ হতে ৭ জানুয়ারী ২০২১ পর্যন্ত সর্বমোট ৩৬৪৭ জন নাগরিক এ জরিপে অংশগ্রহণ করেন (অংশগ্রহণের হার ৮০ শতাংশ)। বাংলাদেশের ৮টি জেলার বিভিন্ন শহর, গ্রাম, এবং বস্তি থেকে রেন্ডম গবেষণা পদ্ধতির মাধ্যমে এ অংশগ্রহণকারীদের বাছাই করা হয়েছে। মুখোমুখি সাক্ষাতকারের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও ভ্যাক্সিন সম্পর্কিত ভাবনা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

ভ্যাক্সিন নেয়ার অভিপ্রায় তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, প্রথম ভাগে ছিল যারা ভ্যাক্সিন নিতে আগ্রহী, দ্বিতীয় ভাগে ছিলো ভ্যাক্সিন নেয়ার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্থ বা নিশ্চিত নয় এবং তৃতীয় ভাগে ছিলো যারা ভ্যাক্সিন নিতে ইচ্ছুক নয়। ভ্যাক্সিনের গ্রহনযোগ্যতা পরিমাপ করা হয়েছে যারা এই গবেষনায় ভ্যাক্সিনটি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যা মোট নমুনার ৭৪.৬ শতাংশ। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৭৪.৬ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন তারা একটি কার্যকরী, নিরাপদ ভ্যাক্সিন চিকিৎসক দ্বারা সুপারিশ করা হলে বিনামূল্যে নিতে আগ্রহী হবেন। ৭.৮ শতাংশ নাগরিক ভ্যাক্সিন নিতে একেবারেই ইচ্ছুক নয়। অপর ১৭.৬% অংশগ্রহণকারী ভ্যাক্সিন গ্রহণ করা বা না করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।

গবেষণায় পাওয়া গেছে দিনমজুরদের মাঝে ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতা অন্যান্য পেশাজীবিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যহারে কম। রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা, ঠেলাগাড়ি চালকদেরও দিনমজুর হিসেবে এ গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে। অর্ধেকেরও কম (৪৬.৮%) দিনমজুর ভ্যাক্সিন গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অন্যান্য পেশাজীবীদের মধ্যে ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতার হার পাওয়া গেছে ৬২ থেকে ৮৩ %।

মাসিক বেতনধারী অফিস কর্মীদের মাঝে ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল সরবোচ্চ। চিকিৎসক ও নার্সদের ভেতরও ভ্যাক্সিনের উচ্চ গ্রহণযোগ্যতার হার পাওয়া গেছে, এ শ্রেণীর ৮১% ই ভ্যাক্সিন নেওয়ার বেপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন পেশাজীবীদের মাঝে ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার এর এই বৈচিত্র নির্দেশ করে যে নিম্ন আয়ের পেশাজিবিরা ভ্যাক্সিন গ্রহণের ব্যাপারে উদাসীন, এমনকি বিনামূল্যে প্রাদান করা হলেও।

এ গবেষণায় আরও উঠে এসেছে শহরে বসবাসকারী নাগরিকরা গ্রামবাসীদের তুলনায় ভ্যাক্সিন গ্রহণে অধিক আগ্রহী। গ্রামবাসীদের ভেতর ভ্যাক্সিন অনিচ্ছা ও দ্বিদ্ধাগ্রস্ততা উভয়ই উল্লেখযোগ্যহারে বেশি পাওয়া গিয়েছে। ৬৪% গ্রামে বসবাসকারী নাগরিক ভ্যাক্সিন নিতে তাদের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন, শহরের নাগরিকদের মধ্যে যার হার পাওয়া গেছে ৮১%। গবেষণায় আরও দেখা গেছে মাত্র ৫৩ শতাংশ বস্তিবাসী ভ্যাক্সিন নিতে আগ্রহী, যা বিভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানের নাগরিকদের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিভিন্ন বয়সের নাগরিকদের মাঝে ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতার হার তুলনা করে দেখা গেছে বৃদ্ধদের (৬০ এর অধিক বয়স) মাঝে অন্যান্য বয়সের তুলনায় ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার কম (৬১%)। ১৮ থেকে ৫০ বছরের অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার প্রায় একই রকম পাওয়া গিয়েছে-যা ৩০ বছরের নিচের অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ছিল ৭৪%, এবং ৩১-৪০ ও ৪১-৫০ বয়স্কদের মাঝে ছিল যথাক্রমে ৭৩% ও ৭৮%। ৫১-৬০ বছরের অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার ৬৮% যা বিভিন্ন বয়স বিভাগের মাঝে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এ ফলাফলের ভিত্তিতে বলা যায়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতার হার নিম্নমুখী।

লিঙ্গ বিবেচনায় ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য পাওয়া যায় নি। ৭৬% পুরুষ এবং ৭৩% নারী ভ্যাক্সিন গ্রহণে ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।

গবেষণাটি বর্তমানে দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন এমন অংশগ্রহণকারীদের মাঝেও ভ্যাক্সিনের গ্রহণযোগ্যতার তথ্য সংগ্রহ করেছে। এতে দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে যারা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, এজমা, কিডনী সমস্যা ইত্যাদিতে ভুগছেন তাদের মাঝে ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় কম। বিভিন্ন ধরণের দীর্ঘস্থায়ী রোগের রোগীদের মাঝে ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল ৫৩ থেকে ৬১ শতাংশের মধ্যে, যা সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার হারের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম।

পূর্বে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝেও অন্যদের তুলনায় ভ্যাক্সিন গ্রহণযোগ্যতার হার যথেষ্ট কম পাওয়া গিয়েছে। কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠা অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের কিছু বেশী (৫৬%) ভ্যাক্সিন গ্রহণে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল ছিল অংশগ্রহণকারীদের ভ্যাক্সিনের পিছনে ব্যয় করার অভিপ্রায়। ভ্যাক্সিনের সাথে মূল্য সংযোজিত হলে সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার হার ৭৪.৬% থেকে কমে নেমে আসে ৪৬% এ। অতএব, অর্ধেকেরও বেশী অংশগ্রহণকারী টাকা ব্যয় করে ভ্যাক্সিন নিতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশে বিস্তৃত পরিসরে ভ্যাক্সিন ক্যাম্পেইন করার ক্ষেত্রে বড় বাধা থাকবে ভ্যাক্সিন বিষয়ে মানুষের আস্থা তৈরী। এ কারণে স্বল্প শিক্ষিত মানুষের জন্যে যোগাযোগ বার্তা এমনভাবে তৈরী করা প্রয়োজন, যা সহজে বোধগম্য হয় এবং মানুষের মাঝে ভ্যাক্সিন বিষয়ে বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিনের ক্ষেত্রে আস্থা তৈরী করতে সমাজের মান্য ব্যক্তিগণ এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমুহের ভ্যাক্সিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য সমস্যার ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে।

এটি বিবেচনায় রাখতে হবে যে এই গবেষণার ফলাফল একটি নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের ভ্যাক্সিন বিষয়ে ভাবনা তুলে ধরেছে। নতুন ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনের সাথে সাথে এবং কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি বিষয়ে মানুষের মনোভাবের পরিবর্তনের সাথে সাথে ভ্যাক্সিন বিষয়ে ভাবনা ও মনোভাবও পরিবর্তিত হতে পারে।

গবেষকদলঃ ড: আহমেদ হোসেন (এনএসইউ), ড: হাসান মাহমুদ রেজা, (এন এস ইউ), জনাব মিনহাজুল আবেদিন (সি আই পি আর বি), ড: ফারাহ নাজ রহমান (সি আই পি আর বি), আমিনুল ইসলাম (ইউল্যাব), ড: জাকির হোসেন (এইচ & আরসি-রংপুর)। আরও বিস্তারিত তথ্য এর জন্য ০১৭১৫৮৮৫৬৫১ (ড: হাসান মাহমুদ রেজা, ডিন, স্কুল অব হেলথ & লাইফ সাইন্সেস, এনএসইউ) নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

ঢাকা, ২৪ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।