একজন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করে যখন ঘুমাতে যাই, মনের মাঝে তখন প্রশান্তি তৈরি হয়'শিক্ষার্থীদের জন্য যা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ'


Published: 2020-09-27 04:21:22 BdST, Updated: 2020-10-21 10:04:57 BdST

মিজানুর রহমান, ঢাবি: নিরাপত্তা মঞ্চ। নামের মাঝে রয়েছে বাহারী ছন্দ। রয়েছে অনুভূতির হাক-ডাক। এই নামের সঙ্গে আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে রয়েছে সহযোগিতা আর সহমর্মিতার বিজয় কেতন। রয়েছে আবেগ আর নিখাদ ভালবাসার অভিব্যক্তি। নামের এক অংশে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জড়াজড়ি যেন নতুন উচ্ছাসার ভাবাবেগ তৈরী করেছে। নাম করণের মুন্সিয়ানায় স্বার্থকতার দাবী রাখে। আর একারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আতুড়ঘর। যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসার নেশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্তে মিশে আছে। বায়ান্ন, ছেষট্টি, একাত্তর, নব্বই কিংবা এক-এগারো দেশের সব ক্রান্তিলগ্নেই ঢাবি শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অনন্য।

কিন্তু গ্রাম কিংবা শহর সর্বত্রই এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হরহামেশাই ক্ষমতাধর অনেকেরই চক্ষুশূল হতে হই প্রতিবাদী এই শিক্ষার্থীদের। তাই প্রতিহিংসাবশত প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের দমাতে মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা, হামলা ও পরিবারের সদস্যদের আঘাত হানতে দ্বিধা করে না তারা। করোনাভাইরাসের কারণে ক্যাম্পাসবন্ধকালীন সময়ে নিজ এলাকায় অবস্থানকালীন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এবং প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। যা স্বাভাবিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

ঢাবি শিক্ষার্থীদের উপর কোথাও অন্যায় ও অবিচার হলে তা রুখে দিতে 'সবাই মিলে গড়ি নিরাপদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হলের সদ্য সাবেক জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার। সংগঠনটি এখন প্রায় ২০ হাজার সদস্যদের পরিবার। ইতোমধ্যে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সাথে ঘটেছে এমন প্রায় ৬৫ টি ঘটনার সমাধান করেছে মঞ্চ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষার্থী অন্যায়ের শিকার হলে কিংবা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে মঞ্চের কর্মীরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে সমাধান করার চেষ্টা করেন। কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার চিন্তা এসেছে জানতে চাইলে জুলিয়াস সিজার তালুকদার ক্যাম্পাসলাইভটুয়েন্টিফোরকে বলেন, "চলতি বছরের ১৮ জুন টাঙ্গাইলের গাড়াবাড়ী গ্রামে নৃশংসভাবে খুন হোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী মোস্তফা ৷ সে দিন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানালেও সংগঠিতভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি ৷

এতে আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি,৷ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থীর মাতৃপ্রতিম প্রেমমন্দির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে! কেন তার সন্তানেরা দেশের সর্বত্র নির্যাতিত হয়ে বেড়াবে! তখনই আমি একটি সার্বজনীন সংগঠনের কথা ভাবি৷ সেই থেকেই শুরু 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ'। আমাকে শুরু থেকে যিনি বহুমাত্রিক সমর্থন দিয়ে আসছেন তিনি হলেন মেহেদী হাসান শামীম ৷ তিনি আমার এস এম হলের শ্রদ্ধাভাজন অগ্রজ। কারিগরি ও সৃজনশীল কাজগুলো শুরু থেকে করছেন মেহেদী কাউসার ফরাজী। আমাদের লোগোটি তারই করা ডিজাইন ৷"

সংগঠনটি কীভাবে কাজ করবে জানতে চাইলে জুলিয়াস বলেন, "প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় বর্তমান শিক্ষর্থীদের সহযোগিতা করে৷ এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাহায্য করেছেন জনাব জোবায়ের জুয়েল রানা। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের এক জন সিনিয়র এএসপি।" "শিক্ষার্থী বন্ধুরা সংগঠনটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আস্থা প্রদর্শন করেছে। আমাদের ফেসবুক গ্রুপটিতে এখন সদস্য সংখ্যা ২০,০০০। প্রতিদিনই এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জুলিয়াস।"

মঞ্চের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জুলিয়াস বলেন, "আমরা এ পর্যন্ত ৬৫ টি সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছি৷ আরো ১৭ টি সমস্যা সমাধানের পথে৷ আশা করি আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে এগুলো নিষ্পত্তি হবে ৷"

টিএসসি কন্যা খ্যাত ফুল বিক্রেতা পথশিশু জিনিয়া অপহরণ হওয়ার পর উদ্ধারকার্যে পুলিশকে সহয়তা করে প্রশংসিত হয়েছে মঞ্চের প্রশাসনিক সহযোগিতা টিমের সমন্বয়ক আরাফাত চৌধুরী। তার টিমের কার্যক্রম সম্পর্ক ক্যাম্পালাইভ২৪ কে আরফাত বলেন, "যেসব ঘটনা পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত আমরা এসব ঘটনা দেখে থাকি। মূলত অধিকাংশ ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ততা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই করে মূলত প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে সাহায্য করার চেষ্টা করি।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের মডারেটর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সিনিয়র এএসপি মো: জুয়েল রানা ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু নিয়েছি। কিন্তু যত নিয়েছি তত দিতে পারিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক আবেগ, ভালোবাসার নাম। আমি যেহেতু পুলিশের কাজের সাথে জড়িত, তাই এ কাজ আমার পেশা ও নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করে যখন রাতে ঘুমাতে যাই, তখন মনের মাঝে যে প্রশান্তি তৈরি হয় তা কখনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

গত ১৬ সেপ্টেম্বর তুচ্ছ ঘটনায় নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা থানার পােগলা ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কেয়া আক্তার কাকলিকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।

মঞ্চের সহায়তায় কাকলিকে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়। কেয়া আক্তার কাকলির বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে গর্ববোধ করি। আজ আমার বিপদের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইয়েরা আমাকে যেভাবে আমার পাশে দাড়িয়েছে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।'

সংগঠনটির কাজ আরো ফলপ্রসূ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে চারটি টিম। সেগুলো যথাক্রমে-সাইবার সিকিউরিটি টিম, আইন সহায়তা টিম, প্রশাসনিক সহায়তা টিম ও নারী নিরাপত্তা টিম। এসব টীমে সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন আরাফাত চৌধুরী, অপি করিম, তাজুল ইসলাম, সোহাগ মিয়া, মাহমুদ হাসান, রুবাইয়া আক্তার প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ ও সিআইডি পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান আরাফ চৌধুরী। ইতোমধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে খুব শীঘ্রই অফিসিয়াল ঘোষণা আসবে বলে জানা যায়।

এছাড়াও এডভোকেট, বিচারক, পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত প্রাক্তন ঢাবিয়ানরাও সেবার ব্রত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চে যুক্ত হচ্ছেন। তবে, অবৈধ কোন কাজে সহযোগিতা কিংবা কোন প্রকৃত দোষীকে বাঁচাতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় না বলে জানিয়েছেন সংগঠন সংশ্লিষ্টরা। কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ সচেতন থাকার চেষ্টা করেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

শুধু শিক্ষার্থীদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষান্ত নয় মঞ্চ। এই সংগঠন অল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনেক শিক্ষামূলক কাজও করছে। তারমধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ। শততম বর্ষে দ্বিগুণ সংখ্যক বা ২০০ জন শিক্ষার্থীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনকে গ্রাফিক ডিজাইন ও ১০০ জনকে ফ্রিল্যান্স রাইটিং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ দেবেন তারা।

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।