চার শীর্ষ ব্যক্তির শেল্টারদাতাদের ব্যাপারেও নজরদারি চলছে- কিস্তি-২অ্যাকশনে এনএসইউ: চাকরি হারাতে পারেন প্রক্টরসহ ৪ শীর্ষ ব্যক্তি!


Published: 2020-05-22 19:48:55 BdST, Updated: 2020-05-31 22:30:56 BdST

মৃদৃল ব্যানার্জি: অ্যাকশনে নেমেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (এনএসইউ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান অসংগতি, ভর্তি বাণিজ্য, প্রবিশান বাণিজ্য, দুর্নীতি, জালিয়াতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, জঙ্গি কানেকশন, গবেষণাপত্রে অনিয়ম, উৎকোচসহ নানান কারণে শুদ্ধি অভিযান চলছে। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ চারজনকে দিয়ে শুরু হলেও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। প্রথমে এই ৪ জনের ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই শীর্ষ ব্যক্তিরা হলেন, সাবেক প্রো-ভিসি প্রফেসর জিইউ আহসান, প্রক্টর প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান খান, নির্বাহী পরিচালক ও প্রশাসনিক প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ সাবের (অব) ও চীফ সিকিউরিটি অফিসার এম ইমরান। জানা যায় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ব্যাপারে নানান বিষয়ে নিয়ে আগে থেকেই শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আপত্তি ছিল। এবার মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর তাদেরকে করা হয়েছে সাসপেন্ড। একই সঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তাদের এট্রি ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

সেই কমিটির প্রধান হলেন প্রো-ভিসি প্রফেসর ইসমাঈল হোসাইন। সদস্য রাখা হয়েছে ৩টি ফ্যাকাল্টির ৩ জন ডীন ও প্রফেসর মোস্তফা কামাল খান এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে ফাইনান্সিয়াল এইড এর পরিচালক জাফর ইকবাল রাসেলকে। এসবের সত্যতার ব্যাপারে প্রো-ভিসি প্রফেসর ইমাঈল হোসাইন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, যথাযথ নিয়ম রীতি ও কারণেই ৪ জনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। কাউকে অন্যায়ভাবে কিছু করার প্রশ্নই আসে না। ওই ৪ জনের বিষয়ে আপত্তিকর ও নানান স্পর্শকাতর অভিযোগ থাকায় বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে দোষী সাব্যস্ত হলে যা করার তাই করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটি আজ-কালের মধ্যে কাজ শুরু করবেন বলেও তথ্য মিলেছে।

এ ব্যাপারে নির্বাহী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ সাবের (অব) ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে আমি কিছুই জানি না। আপনাকে কি ই-মেইলে কোন কিছু জানানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মেইল চেক করিনি। আর যেসব অভিযোগ জানতে পারলাম এসব কেন করেছে এটা আমার বুঝে আসে না। সেই আলোচিত তরিকুলের সঙ্গে গেটে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। বলেন আমি কিছুই জানি না।

তরিকুল কানেকশন:

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসমিস শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সহ সভাপতি (দুর্নীতি ধরার পর বহিস্কৃত) তরিকুল ইসলাম মমিনের সঙ্গে সখ্যতা ও দহরম মহরমের কারণে নানান অপকর্ম ও অপরাধ সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন ডীন ও সাবেক প্রো- ভিসি, ও গবেষণা পরিচালক প্রফেসর জিইউ আহসান ও প্রক্টর নাজমুল আহসান খান। বিষয়টি ছিল ক্যাম্পাসে ওপেন সিক্রেট।

এই সেই প্রতারক তরিকুল

 

ডীন ও সাবেক প্রো- ভিসি, ও গবেষণা পরিচালক প্রফেসর জিইউ আহসান ও প্রক্টর নাজমুল আহসান খানকে একাডেমিক সকল কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তারা যেন তদন্ত কালীন সময়ে ক্যাম্পাসে কোন ক্লাস বা বিভাগের কোন একাডেমিক বিষয়ে নাক না গলান তাও নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তারা দুজন মিলে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও স্বাক্ষর জালজালিয়াতির হোতা তরিকুল ইসলামকে ২০১৮-২০১৯ সালে একটি বিদেশী গবেষনায় সিনিয়র অথার দেখান। সেই আবেদনে প্রথমে তরিকুল ইসলামকে সিনিয়র গবেষক দেখিয়ে প্রথমে তার নাম ও পরে গিয়াশ উদ্দীন আহসান মানে জিইউ আহসান ও পরে নাজমুল আহসানের নাম পাঠানো হয়। অথচ তরিকুল ইসলাম তখন নর্থ সাউথের ছাত্র নয়। তাকে ডিসমিস করে দেয়া হয়েছে। আর তার এট্রি ব্লক করে দেয়া হয়েছিল।

সূত্র জানায়, জিইউ আহসান চেয়েছিলেন প্রো-ভিসি হতে আর নাজমুল আহসান চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হতে। আর ওই দুটি নিয়োগের তদবীর নিয়েছিলেন সেই তরিকুল। এ জন্য এরা দু'জন তরিকুলকে মোটা অংকের নজরানাও দিয়েছিলেন বলে তরিকুল পুলিশ ও গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন। আর সেই তরিকুলকে উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন বিদেশে গবেষণার সুযোগ। একজন অবাঞ্ছিত ছেলের সঙ্গে এই দুই প্রফেসরের সখ্যতাকে ভাল ভাবে নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সূত্র জানায়, এমনকি নাজমুল আহসানের কক্ষে তরিকুল একসময় ৫ ঘন্টা পর্যন্ত বৈঠক করার প্রমাণও পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাছাড়া সেই তরিকুল ফেব্রয়ারী ও মার্চ মাসে অন্তত ২১ বার ক্যাম্পাসে এসেছে।

এসময় জিইউ আহসান ও নাজমুল আহসান ও ব্রিগে. সাবেরের সঙ্গে খোশ গল্প করতে দেখা গেছে। এ ব্যাপারে প্রফেসর নাজমুল আহসান ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমি কি আর বলবো। আমি ট্রেজা  রার হতে আবেদন করেছিলাম। এর বাইরের কিছুই জানি না। আমি প্রক্টর হিসেবে তরিকুলকে চিনতাম। আমার কাছে অনেকেই তো আসে। আমি মানা করতে পারি না। তাছাড়া ৫ ঘন্টা কিভাবে বসে গল্প করবো। আমার ক্লাসও তো আছে। এটা ঠিক না। ডিসমিস ও সব বিষয়ে ফেল করা একজনকে গবেষণায় কিভাবে সিনিয়র হিসেবে নাম দিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তাকে ভাল করতে চাইছিলাম। মোটিভেট করতে চাইছিলাম। আপনার দেশী হিসেবে তরিকুলের প্রতি দায়িত্ব একটু বেশী হলো না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না আমি কোন লোভে -টোপে- নই এমনিতেই একটু সমস্যা হয়ে গেছে। কেন যে তার নাম দেয়া হলো...

এক সময়কার ডাকসাইটের প্রফেসর জিই্উ আহসান। নানান চল-চাতুরী করে ৩ বছর প্রো-ভিসি (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রচন্ড দাপটে দাবড়ে বেড়াতেন ক্যাম্পাস জুড়ে। তিনি জাহির করে বেড়াতেন ট্রাস্টিদের কাছের মানুষ হিসেবে। এক সময়কার পুলিশের আইজি ড. জাভেদ পাটোয়ারীর ঘনিষ্ট বন্ধু বলেও ক্যাম্পাসে বলে বেড়াতেন। বলতেন আমার ফাইল তো পাটোয়ারী নিজেই পিএম অফিসে নিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই এসব তথ্য জানেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোন অনুষ্ঠান নেই যেখানে তার ছবি নেই। এমনকি বোর্ড মেম্বার অথবা ভিসির ছবি না থাকলেও ওই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জিইউ আহসানের ছবি সেখানে স্থান পেত। বিভিন্ন জার্নাল ঘটলেই এর সত্যতা মিলবে।

দায়িত্বশীল সূত্রটি আরো জানান, প্রেসিডেন্ট প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন প্রফেসর ইসমাঈল হোসাইনকে। ২০১৮ সালের ২ জুলাই তাকে অফিসিয়াল চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু তরিকুল ও তার সহযোগীরা ওই চিঠি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় অফিস, ইউজিসি, শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিস্ট দফতরে যাতে না পৌঁছে সেই ব্যবস্থা করে। গায়েব করে দেয় সেই চিঠিটি। তবে বিওটি এর একজন কর্মকর্তা ওই বিষয়ে ও ট্রাস্টের ২/১ জন জানতেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বোর্ড দ্রুত প্রফেসর ইসমাঈল থেকে শারিরীক অবস্থা ভাল নয় এই বলে উড্রো লেটার নিয়ে নেন। তার পর একটি নতুন প্যানেল করে পুনরায় পাঠানো হয়। এভাবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে যখন আবার তাগিদ আসে কিভাবে জিইউ আহসান প্রো-ভিসি আছেন, তার তো কোন এপ্রোভাল নেই। পরে ২০১৯ সালের আগস্টে তিনি ১৩ মাস পর সেই লোভনীয় পদটি ছেড়ে দেন।

১৩ মাস প্রেসিডেন্টের সার্কুলারকে বৃদ্দাঙ্গলী দেখিয়ে ভর্তি বাণিজ্যের কারণে প্রো-ভিসি হিসেবে দখল করে থাকা প্রফেসর জিইউ আহসান ক্যাম্পাসলাইভকে আরো জানান, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানিনা। চিঠি আমার কাছে আসে না। আমাকে ট্রাস্টি বোর্ড দায়িত্ব দিয়েছে। আমি সেই দায়িত্ত্ব পালন করেছি মাত্র। তরিকুলের ব্যাপারে তিনি বলেন ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ তদবীরসহ রাজনৈতিক তদবীর তরিকুল করেছে বলে শুনেছি। তবে আমার কাছে কোন লিখিত অভিযোগ নেই। প্রে-ভিসি হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও ইউজিসির কোন চিঠি পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি তেমন কিছু বলতে রাজী হননি।

এমনকি অবৈধভাবে ১৩ মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে কিভাবে রাখলেন জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার বিষয়টিও সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি। এছাড়া গবেষণা পরিচালক হিসেবে কিভাবে একজন অছাত্র ও ডিমমিস ছাত্র তরিকুলের নাম তার থেকে সিনিয়র দেখিয়ে বিদেশে পাঠালেন এ বিষয়টি নিয়েও তিনি অনেকটা উদাসীন। নিজেকে নির্দোশ দাবী করে অন্য একজন প্রফেসরের দোষ দিলেন তিনি।

গবেষণায় স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি

 

সূত্র জানায়, জিইউ আহসান ও নাজমুল আহসানরা মিলে ভর্তি বাণিজ্য, প্রবিশন বাণিজ্য সহ গোপনীয় বিভিন্ন নথিপত্র গোপনে সেই তরিকুলের কাছে দিয়ে দিতেন। ফেলকরা শিক্ষার্থীদের তালিকা, সফট টিচারের কাছে শিক্ষার্থীকে দিয়ে দেয়া, ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের তালিকা ও ভর্তি বিষয়ে কনসালটেন্সির দায়িত্ব পালন করতো তরিকুল। আর ভেতর থেকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অর্থাৎ উল্লেখিত ব্যক্তিগণ ছাড়াও বিওটির একজন ডেপুটি ডাইরেক্টর, একজন সচিব, ২/১ জন প্রভাবশালী ট্রাষ্টি বিশ্বদ্যিালয়ের নানান অপকর্মের সঙ্গে জড়িত আছে বলে তরিকুল পুলিশ ও গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন।

এছাড়া আরো কয়েকজনের নাম আছে যারা তরিকুল সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলো। তাদের আশকারাতেই বেসামাল হয়ে উঠে তরিকুল চক্রটি। এরা তাকে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নানান অপকর্ম করাতে সবসময় উৎসাহ দিতেন। সব ধরনের সহায়তাও করেছেন বলে তরিকুল জানিয়েছেন। এচাড়া এসব সিন্ডিকেটের শীর্ষে যারা আছেন তাদের ব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। যারা দেশে-বিদেশে অবস্থান করে তরিকুল গংদের সহায়তা দিয়েছিল ও তদবীর করাতো তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হতে পারে বলে তথ্য মিলেছে।

নর্থ সাইউ বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে একজনকে প্রক্টর ও অপর একজনকে ডীনের দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন। তারা সেই দায়িত্ব বুঝেও নিয়েছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

ঢাকা, ২২ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

 

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।