করোনা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈকতের মানবিক সংগ্রাম


Published: 2020-05-17 16:39:30 BdST, Updated: 2020-05-26 09:40:17 BdST

ঢাবি লাইভঃ প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের কারণে সারা দেশেই যেন অচল অবস্থা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায় সৈকত তাদের দলে। করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ও আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণার পর সবাই যখন ফিরেছে নিরাপদ নিবাসে, তখন তিনি দুর্গত মানুষের কথা ভেবে রয়ে গেছেন এই শহরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে নির্ভরশীল শ্রমজীবী এবং ছিন্নমূল মানুষের সেবা করার ব্রত দিয়ে দুই মাস ধরে নিরন্তর পরিশ্রম করে চলছে তার। তার প্রচেষ্টায় প্রতিদিন দুই বেলা আহার পাচ্ছে অন্তত দেড় হাজার মানুষ। বন্ধু-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তা নিয়ে এই বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনাকারী তানভীর হাসান সৈকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত সদস্য। ডাকসু সদস্য হিসেবে সৈকত শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন এর আগেও।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গিয়ে দেখা যায়, রাজু ভাস্কর্যের সামনের রাস্তায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সুশৃঙ্খলভাবে বসে আছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। সৈকত তার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রত্যেকের কাছে গিয়ে ইফতারি হিসেবে হাতে তুলে দিচ্ছিলেন রান্না করা খাবারের প্যাকেট। দুই মাস ধরে এভাবেই অনাহারী মানুষের খাবারের জোগান দিচ্ছেন সৈকত। যারা খাবার নিতে আসেন, তাদের বেশিরভাগের সঙ্গেই দেখা গেল সৈকতের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। খাবার বিতরণের ফাঁকে ফাঁকে সবার খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন তিনি।

খাবার নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন তারা। সেই দুঃসময়ে তাদের দুই বেলা খাবারের বন্দোবস্ত করেন সৈকত। রান্না করা খাবারের পাশাপাশি ত্রাণ হিসেবে তাদের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যও বিতরণ করেছেন তিনি। রমজান মাস শুরু হওয়ার পর মুসলিমদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে ইফতার ও সেহরির। অন্য ধর্মাবলম্বীদের দেওয়া হচ্ছে দুপুরের খাবারও।

আর্তমানবতার সেবায় প্রশংসনীয় এই উদ্যোগের ব্যাপারে সৈকত জানান, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নিম্ন আয়ের মানুষ যেন খাবারের সংকটে না ভোগে সেজন্যই তিনি এই পদক্ষেপ নেন। গত ২৩ মার্চ থেকে খাবার বিতরণ শুরু করেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ৫০ জনকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

পরে অন্য অনেকের সহায়তায় আরও বেশি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। বর্তমানে প্রতিদিন ইফতারে খাবার দিচ্ছেন ৮০০ থেকে এক হাজার মানুষের মাঝে। সেহরির ব্যবস্থা হয় প্রায় ৬০০ মানুষের জন্য। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী এই পরিস্থিতিতে সমস্যায় রয়েছেন, তাদের জন্যও যথাসাধ্য সহায়তার চেষ্টা করছেন সৈকত।

এই কাজে অনেকের সহায়তা যেমন পেয়েছেন, তেমনি অনেকের কাছে পাননি কাঙ্ক্ষিত সুবিধাও। দুঃখ নিয়ে সৈকত জানান, ডাকসুর সদস্য হিসেবে শুরুতে তিনি সাংগঠনিকভাবেই মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতনের কাছে পাননি তেমন কোনো সহায়তা। বারবার অনুরোধের পরও টিএসসির রান্নাঘরটি পর্যন্ত তাকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এমনকি কয়েকবার তার এই কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টাও চালানো হয়েছে। তারপরও হাল ছাড়েননি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য সৈকত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগের এই শিক্ষার্থী বলেন, একজন ছাত্রনেতা এবং ঢাবি শিক্ষার্থী হিসেবে এই সংকটকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার কর্তব্য। আমি চাই না, এই মহামারির সময়ে কেউ না খেয়ে থাকুক। তাই কয়েকজন বন্ধু এবং অন্যদের সাহায্যে টিএসসি প্রাঙ্গণে লাকড়ির চুলা বসিয়ে খাবার রান্না করছি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে সহায়তা না পেলেও শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক সহায়তা ও উৎসাহ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাই-বন্ধুরাও এগিয়ে এসেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগসহ অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রায় দশ দিনের খাদ্যসামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) মতো প্রতিষ্ঠানও।

এ বিষয়ে সৈকত জানান, আপাতত তার কাছে আরও এক সপ্তাহের খাবার বিতরণের রসদ মজুদ রয়েছে। এরপরের খরচ জোগাতে আপাতত নিজের প্রিয় মোটরসাইকেলটি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। সমাজের বিত্তশালীদের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কেউ এগিয়ে আসতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন ০১৬৮৪০২৩৪১১ নম্বরে।

ঢাকা, ১৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।