ঢাবির দেয়ালে দেয়ালে নিপীড়নের গ্রাফিতি, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা


Published: 2019-10-10 14:04:51 BdST, Updated: 2019-12-08 11:48:50 BdST

মো. রাসেল সরকার, ঢাবিঃ বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেয়ালচিত্রে ফিরে এসেছে গেস্টরুম-গণরুম নিপীড়নের বলি হওয়া হাফিজুর মোল্লা, আবু বকর ও নির্যাতিত এহসান রফিকের গ্রাফিতি।

‘গেস্টরুম-গণরুম নিপীড়নের প্রতীক’ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে বার বার ভেসে উঠে তাদের নাম ।

বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের দেয়ালে দেখা যায়- বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের গ্রাফিতি। 'জাস্টিস ফর আবরার' খচিত এই চিত্র যেন নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের প্রতীক। তার পাশেই কলাভবনের দেয়ালে দেখা যায় রক্তাক্ত চোখ ও বিধ্বস্ত চেহারার এহসান রফিকের চিত্র।

ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়া নিয়ে গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ২টা থেকে পরদিন বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এহসানকে তিন দফা পেটান ঢাবির এসএম হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে তার একটি চোখ মারাত্মক জখমসহ কপাল ও নাক ফেটে রক্ত বের হয়।

ওই রাতে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে ছাত্রলীগের হল শাখার সভাপতির কক্ষে তাকে আটকে রাখা হয়।পরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে এই নির্যাতনের স্মৃতি নিয়ে দেশ ছাড়েন এহসান।

দেয়ালচিত্র

 

এহসান রফিকের দেওয়াল চিত্রে পাশেই দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিকের চিত্র। টাঙ্গাইলের দিনমজুর বাবার সন্তান আবু বকর সিদ্দিক পড়তেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। থাকতেন স্যার এফ রহমান হলে। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মারা যান তিনি।

এছাড়া ভিসির বাসভবনের দেয়ালে আঁকা হাফিজুর মোল্লার গ্রাফিতিতে দেখা যায় গেস্টরুম নির্যাতনের প্রতিবাদ। সাড়ে তিন বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর মোল্লার (১৯) করুণ মৃত্যু দেখেছিল বাংলাদেশ। এত দিন পর ক্যাম্পাসের দেয়ালচিত্রে সেই হাফিজুর ফিরে এসেছেন ‘গেস্টরুম অত্যাচারের প্রতীক’ হিসেবে।

অটোরিকশাচালকের ছেলে হাফিজুরের বাসা ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য ছিল না। তাই ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে উঠেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হলের বারান্দায়। গভীর রাতেও তাঁকে যেতে হতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসের শেষ ভাগে শীতের রাতের ধকল সইতে না পেরে নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

হাফিজুরের ছবিসংবলিত বেশ কয়েকটি দেয়ালচিত্র এখন দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। ‘গেস্টরুম অত্যাচারের প্রতীক হাফিজুর মোল্লা’। পাশেই কালো কালিতে লেখা ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’।

দেয়ালচিত্র

 

এ ছাড়া ডাকসু ভবনের দক্ষিণ পাশের দেয়াল, ক্যাফেটেরিয়ার দেয়াল ও প্রবেশমুখেও একই রকম দেয়ালচিত্র ও স্লোগানের দেখা মিলবে। আবার ক্যাফেটেরিয়ার সামনে একচিলতে জায়গার নামকরণ করা হয়েছে ‘হাফিজ চত্বর’ নামে।

এ ধরনের দেয়ালচিত্র ‘গ্রাফিতি’ নামে পরিচিত। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার শিল্পিত মাধ্যম হিসেবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই গ্রাফিতিগুলো আঁকা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মঞ্চ ‘বৈধ সিট আমার অধিকার’–এর উদ্যোগে।

মঞ্চের অন্যতম সংগঠক আরমানুল হক ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, "বৈধ সিট আমার অধিকার’–এর উদ্যোগে আমরা ক্যাম্পাসে কয়েকটি গ্রাফিতি এঁকেছি। বুধবার বিকালে মুমিন মুক্তার সবুজ কলা ভবনের পেছনের দেয়ালে গেস্টরুম কালচারের শিকার এহসান রফিকের এই অসাধারণ গ্রাফিতিটা এঁকেছিলেন।

আমরা তাকে গ্রাফিতির বিভিন্ন কাজে সাহায্য করছিলাম। গ্রাফিতি আঁকার পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আমাকে কলা ভবনের অফিসে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নানান ভাবে জেরা করে। ৩০ মিনিট পর মুমিনকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কলা ভবনের ডীন ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন স্যার আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে এবং এগুলো মুছে ফেলতে বলে।

আর কোনোদিন এই ধরনের রাজনৈতিক চিত্র আঁকতে তিনি নিষেধ করেন। উনি বলেছেন এই দেয়ালে নাকি আর কাউকে আঁকতে বা লিখতে দিবে না। এভাবে কিছুক্ষণ হুমকি ধামকি দিয়ে তিনি আমারদের নাম, ফোন নাম্বার ও সব ইনফরমেশন রেখে দেন।"

দেয়ালচিত্রে আবরার

 

আরমানুল হক বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের টাকায় পরিচালিত। এখানে প্রতি ইঞ্চি দেয়ালের উপর আমাদের অধিকার আছে। যৌক্তিক যেকোন বিষয় নিয়ে দেওয়ালিকা বা গ্রাফিতি করা আমাদের অধিকার আছে। আমরা ডীনের এই কর্মকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

এবিষয়ে কলা ভবনের ভারপ্রাপ্ত ডীন প্রফেসর ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আর্টস ফ্যাকাল্টির সৌন্দর্য বজায় রাখতে আগে থেকেই এখানে আঁকাআঁকি নিষেধ।

এখানে কোথাও কোনো লেখালেখি নেই। আমরা কিছুদিন আগে রং করেছি। আমি তাদের দুজনকে ডেকে এনে বলেছি, এরপর থেকে আর কখনো লিখলে আমি কিন্তু তোমাদের ডাকবো। আমি তাদেরকে বলছি এগুলো কি তেমরা মুছে ফেলবা, নাকি আমি মুছে ফেলবো? তারা বলছে আপনি মুছে ফেলেন। পরেতারা তাদের ফোন নম্বর ও পিতার নাম দিয়ে গেছে।

দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতিগুলো মুছে ফেলা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো কয়েকদিন থাকবে। তারপর মুছে ফেলা হবে।"

ঢাকা, ১০ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.ম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।