ট্রেনে পা হারানো ঢাবি ছাত্রের বদলে যাওয়া বেদনার গল্প


Published: 2019-01-14 01:57:31 BdST, Updated: 2019-04-23 08:49:10 BdST

সিরাজগঞ্জ লাইভ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে পড়াশোনা করেন শফিকুল ইসলাম শান্ত। স্বপ্ন দেখছিলেন নিজেকে মেলে ধরার। সংসারের মধ্যমনি ওই মেধাবী ছাত্রটি দ্বিতীয় বর্ষেই হোচট খেয়েছেন। ট্রেনের চাকায় কেটে গেছে তার দুই পা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্ছল সেই ছেলেটির জীবন এখন বদলে গেছে। পাল্টে গেছে স্বপ্নও। অচল পা নিয়ে এখন তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরতে পারছেন না। কবে তার কৃত্রিম পা জোড়া লাগবে। কবে আবারো হাঁটতে পারেবন কেউ জানে না।

তবুও আশায় বুক বেঁধে আছেন সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মীরপুর বিড়ালাকুঠি মহল্লার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শাহজাহান আলী খান। ছেলেকে নিয়ে এখনও স্বপ্ন দেখেন তিনি। অন্যদিকে দুর্ঘটনার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর হারিয়েও উদ্যম কমে যায়নি শান্তর। জানালেন, কৃত্রিম পা ফিরিয়ে দিতে তার জীবনের গতি।

পড়ালেখা শেষ করে মানবতার সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে চান তিনি। দুই সন্তানের মধ্যে শান্ত সবার ছোট। বড় ভাই শাহ আলম তার চাচার টিনের দোকানের ব্যবসা দেখাশোনা করেন। মা গৃহিনী। শান্ত লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী। স্কুলজীবন শেষ করেন সিরাজগঞ্জের বিএল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। কলেজজীবন কেটেছে ঢাকার উত্তরা মডেল কলেজে। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাবিতে ফলিত গণিত বিষয়ে ভর্তি হন শান্ত। ফজলুল হক হলে ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন, রচনা, আবৃতি ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতায়ও তার প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে। বৃটিশ কাউন্সিলসহ জেলা পর্যায় থেকে অর্জন করেছেন অনেক পুরস্কার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ট্রেনে পা হারানোর পর শান্তর চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে তাদের। পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা চলেছে টানা এক মাস সতের দিন। বাবার পেনশনের টাকাসহ ধারদেনা করে এপর্যন্ত ১৫লাখ টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছেন না তারা। যদিও ঢাবির ফলিত গণিত বিভাগের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন শিক্ষক শান্তর সমস্ত চিকিৎসা খরচ বহনসহ উন্নতমানের দুটি কৃত্রিম পা সংযোজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সামাজের বিত্তশালী ব্যক্তি বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও দাঁড়ায়নি শান্তর পাশে।

মা শাহিদা খানম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন- আমার শান্ত আগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে মা বলে ডাক দিয়ে আমার বুকে মাথা রাখতো, জড়িয়ে ধরতো। সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। আজ সেই নাড়ি ছেঁড়া বুকের ধন নিরব নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষ দেখলে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এক সময় সে ছিলো বেশ চঞ্চল। কারও বিপদের কথা শুনলেই ছুটে যেত। প্রতিবেশী ও বন্ধুরাও তাকে অনেক ভালোবাসতো। এখন মাঝে মধ্যে বন্ধুরা এসে তাকে সঙ্গ দেয়, শান্তনা দেয়। আমার ছেলেটা আগে মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায়। এজন্য কৃত্রিম পা সংযোজনের প্রয়োজন। এর ব্যয়ভার বহন করার সামর্থ্য আমাদের নেই।

শফিকুল আলম খান শান্ত বলে, মানবতার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিপূর্বে অনেক অসহায় পরিবারকে সহায়তা করে তাদের উজ্জল ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছেন। তার সহায়তা পেলে আমিও ফিরে পেতে পারি স্বাভাবিক জীবন। লেখাপড়া শেষে আত্মনিয়োগ করতে পারবো দেশ ও মানবতার কল্যাণে।

উল্লেখ্য, ২০১৮সালের ২২ জানুয়ারি স্বরসতী পূজার ছুটি শেষে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী ষ্টেশন থেকে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেক্স ট্রেনযোগে ঢাবির উদ্দেশে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন শান্ত। স্টেশনে পৌঁছার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিলে দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে পা পিছলে ট্রেনের নিচে পড়ে যান তিনি। কেটে যায় তার ‘দুটি পা’। এরপরের গল্পটা তার বেদনার। আমরা আশা করবো শান্ত আবারো ক্যাম্পাসে ফিরে আসবেন। বন্ধুদের আড্ডা মাতিয়ে তুলবেন। বাবা-মায়ের স্বপ্ন সফল করে তুলবেন। সেই প্রত্যাশায়...

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।