স্বপ্ন ভাঙছে মঙ্গল-তরী দলের!


Published: 2019-04-29 21:46:40 BdST, Updated: 2019-05-24 15:36:36 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: 'মঙ্গল-তরী', শব্দটি শুনলে প্রথমে সবাই বলে মঙ্গোল গ্রহের নৌকা। কিন্তু, ব্যাপারটা কি আসলেই তাই? মঙ্গল গ্রহে এখনো পানির সন্ধান চলছে, তাহলে বিনা পানিতে নৌকা কি করে চলবে !!

প্রকৃত অর্থে 'মঙ্গল-তরী' হচ্ছে মঙ্গোল গ্রহে চলার উপযোগী একটি পরবর্তী প্রজন্মের রোভার। নামটাই জানান দিচ্ছে, এটি কোনো এক দুঃসাহসিকতা বা পাগলামীর ব্যাপার। হ্যা, এইটি আসলেই একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করার দুঃসাহসিকতা, পাগলামী ও প্রতিযোগিতা। আর এই স্বপ্ন চোখে নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি আমরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।

আমাদের কোনো শুক্রবার নেই, ছুটির দিন নেই, উৎসব নেই, নিরলস পরিশ্রম আর পরিশ্রম, আবার ক্লাস মিস করলে বার্ড হয়ে যাওয়ার হুমকি খেতে হয়, সিজিপিয়ের খোটা শুনতে হয়, জীবন নিয়ে কোনো প্ল্যানিং এখনো নেই, খাওয়া-দাওয়া এর ঠিক নেই, বাসায় দেরি করে ফিরে বাবা-মা এর বকা-ঝকা শুনতে হয়, পদে পদে হেনস্থ হতে হয় এই ধরণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।

কিন্তু তবুও আমরা কাজ করে যাই শুধু মাত্র একটা আশা নিয়ে। আশাটা অযৌক্তিকও কিছু না, শুধু চাই সারা বিশ্বের সামনে আমরাও বাংলাদেশকে তুলে ধরি। বিশ্বের মানুষ জানুক আমরাও কিছু জানি, আমরাও কিছু করতে পারি।

শুধু মাত্র দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরে, লাল সবুজ পতাকা আন্তর্জাতিক আঙিনায় উড়তে দেখার জন্য গতবছর ৯৬ টি দলের মধ্যে থেকে ১৩তম হবার পরেও আমরা এইবার আবার রেজিস্ট্রেশন করি বিশ্বের সবথেকে কঠিনতম প্রতিযোগীতায়, 'ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০১৯' তে।

বিশ্বখ্যাত নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানুষ স্বপ্ন দেখে ভর্তি হয়ে দেশের বাইরে পড়াশোনা করার, তাদেরকে টেক্কা দিতে আমাদেরকে নিয়ে যেতে হয় ৫০ কেজি ওজনের মঙ্গোল গ্রহের উপযোগী নিজেদের ডিজাইন করে বানানো রোবট। ইউএসএ এর মার্স সোসাইটি আয়োজিত এই রোবটিক প্রতিযোগিতায় মূলত চার ধরণের কাজ এই রোবটটিকে করতে হবে-১. ইকুয়েপমেন্ট সার্ভিসিং, ২. অটোনোমাস ট্রাভার্সাল টাস্ক, ৩. সায়েন্স টাস্ক এবং ৪. এক্সট্রিম রিট্রাইভাল ও ডেলিভারি টাস্ক।

সদস্যদের সাথে মঙ্গল-তরী দল

 

এই কাজগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন একটি রোবট তৈরী করতে হবে যা মঙ্গোল গ্রহের পরিবেশে চলতে সক্ষম। শুধু চললেই হবে না, এটিকে যেমন খোঁজ করতে হবে প্রাণের অস্তিত্বের উপস্থিতি আবার তেমনিভাবে নভোচারীকেও তার কাজে সহযোগিতা করার সক্ষমতা রাখতে হবে। আর এই জন্য প্রতিযোগিতায়, প্রতিযোগীর সংখ্যাও কম নয়, সারা বিশ্ব থেকে ৮৪ টি দল এইবার রেজিস্ট্রেশন করেছিলো।

যেহেতু এটি কোনো সাধারণ প্রতিযোগিতা নয় তাই স্বাভাবিক ভাবেই এর বাছাইকরণ এর প্রক্রিয়া জটিল। এর কয়েকটি ধাপ এর মধ্যে সব থেকে ভয়ংকর ধাপটি হচ্ছে 'সিস্টেম এক্সেপ্টেন্স রিভিউ'। এইখানে সবগুলো দলের পাঠানো ভিডিও ও রিপোর্ট অনুযায়ী মার্কিং করা হয়। এরপরে শুধুমাত্র বিশ্বসেরা ৩৬টি দলকে সুযোগ দেয়া হয় ইউআরসি এর চুড়ান্তপর্বে লড়াই করে বিজয়ী হবার। আর বাংলাদেশ থেকে আমরা ১০০ তে ৮৮.৩১ স্কোর করে স্থান করে নিয়েছি প্রতিযোগিতার মূল ও সর্বশেষ পর্বে।

আসছে আগামী ২৯ মে থেকে প্রতিযোগিতার মূল পর্ব শুরু হবে মার্স ডেসার্ট রিসার্চ স্টেশন, উটাহ, ইউএসএ তে। ইতিমধ্যে আমাদের রোবট তৈরির কাজ ও প্রায় শেষ, ইনভিটেশন লেটারসহ ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্রাদিও চলে এসেছে মার্স সোসাইটি এর পক্ষ থেকে। সমস্যা এখন শুধুই অর্থায়নের!

বিগত ২ বছর আমাদের দলের সমস্ত অর্থায়ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করেছে এবং এর জন্য আমরা আন্তরিকভাবে তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এই অর্থবছরে পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের এই প্রতিযোগিতায় যাওয়ার অর্থ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।

এর থেকেও দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের সমাজ এখন অপসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী বেশি। আবার কিছু লোক আছেন যারা শুধু মুখেই প্রশংসা করে যান হোক তা ফেসবুকে বা সরাসরি। কিন্তু শুধু প্রশংসা দিয়ে যে সব কিছু করা সম্ভব না এইটাও আমাদের সবার বুঝতে হবে।

আজকে আমরা স্পনসরের জন্য যত জায়গাতেই যাই একটাই কথা শুনতে হয় আমাদের, "তোমরা প্রাইভেট এ পড়, অনেক টাকা আছে তোমাদের বাবা-মা এর", "তোমরা কনসার্ট করো, তাহলে বেশি লোক জন দেখতে পারবে আমাদের ব্র্যান্ডিং বেশি হবে..."। আর শুধু মাত্র এই বাজে চিন্তাই আজকে আমাদের হেরে যাবার একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামীকাল পত্রিকায় যখন দেখবেন এই প্রতিযোগিতায় অমুক দেশের তমুক বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তখন তো ঠিকই বলবেন "আমরা পারি নাই, মেধা নাই, দক্ষতা নাই"...কেও ট্রল করবে আর আপনিও শেয়ার দিবেন। এইটা কখনোই দেখেন না কেন আমরা হেরেছি, সবাই নিজেদের চাকরি, প্রমোশন, বসের খুশি, টার্গেট ফুল করা আর কোম্পানি এর ব্র্যান্ডিং নিয়ে ব্যস্ত। কখনও কি ভেবে দেখেছেন আজকে আমাদের জায়গায় আপনার ছেলে/মেয়ে থাকলে কি করতেন আপনি!

আজকে মাত্র ১০ লক্ষ টাকার এর অভাবে আমরা বিশ্বের সব থেকে কঠিন প্রতিযোগিতার মূল পর্বে অংশ নিতে পারছি না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বিজয়ের এই লড়াইয়ে টিকে থেকেও হেরে যেতে বসেছি। পারছি না বাংলাদেশের পতাকা, আমেরিকার মার্স ডেসার্ট রিসার্চ স্টেশন এর মাঠে তুলতে।

দুঃখিত এত বড় একটা লেখা দিয়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্যে কিন্তু আপনার একটু সহযোগিতা আমাদেরকে দেশের জন্য ভবিষ্যতেও কাজ করতে সাহায্য করবে।

 

ঢাকা, ২৯ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।