ড্রোন তৈরির স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে “রোবো গ্যাং”


Published: 2019-02-09 21:45:09 BdST, Updated: 2019-02-22 07:00:08 BdST

বশেমুরবিপ্রবি লাইভ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) প্রবেশ করলে প্রায়ই চোখে পড়বে আকাশে ড্রোন ওড়াতে ব্যস্ত একদল শিক্ষার্থীকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলক্ট্রনিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইন্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের এই শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ সময় কাটে গবেষণাগারে।

দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যখন স্বপ্ন দেখছে পুথিগত বিদ্যা অর্জন করে বিসিএস ক্যাডার কিংবা ভালো চাকুরীজীবী হওয়ার তখন এই শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে প্রযুক্তিক্ষেত্রে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরির, যেই বাংলাদেশ ড্রোন আমদানি নয় রপ্তানি করবে,যেই বাংলাদেশ সোফয়ার মতো রোবট কে আমন্ত্রন জানাবেনা বরং সোফিয়ার থেকেও উন্নত রোবট তৈরি করবে। আর এই স্বপ্ন নিয়েই ইইই বিভাগের এই শিক্ষার্থীরা গঠন করে "রোবো গ্যাং" টিম।

চরজন শিক্ষার্থীর এই ছোটো দলটি মাত্র দু বছরেই বেশ কয়েকটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করেছে,সর্বশেষ তারা চ্যম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত "রোবো কার্নিভাল-২০১৯"।

এ প্রতিযোগিতায় দেশের প্রায় ২০ টি বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। রোবোট নিয়ে স্বপ্ন দেখা চারসদস্যের এই "রোবো গ্যাং" টিম এর প্রধান উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান এবং অপর তিনজন সদস্য হলেন ওহিদুর রহমান বাপ্পি,হাবিবুল্লাহ নিয়ন এবং তানভীর আহমেদ রিমন।

এই চার মেধাবী তরুণের একসাথে কাজ শুরুর গল্পটা একটু অন্যরকম। মেহেদী হাসানের বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলে হবে একজন ইসলাম ধর্ম বিশেষজ্ঞ, এই উদ্দেশ্যে ছেলেকে পড়িয়েছিলেন মাদ্রাসায়। কিন্তু ছেলের আগ্রহ ছিলে বিজ্ঞানের প্রতি। তাই মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর স্বপ্ন দেখছিলেন ইলেকট্রনিকাল এবং ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার।

তবে স্বপ্নের পথে প্রথমেই বাঁধা দিলেন বাবা,কিন্তু মেহেদী তার অবস্থানে ছিলেন অনড়। একটা সময়ে তাই বাবাও হার মানেন ছেলের স্বপ্নের কাছে,তবে বাবা ছেলের মান অভিমানে প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহন করতে পারেন নি মেহেদী।

দ্বিতীয়বার ভর্তির সুযোগ পান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে তিনি বেছে নেন বশেমুরবিপ্রবিকে। ওয়াহিদুর রহমান বাপ্পীর স্বপ্ন ছিলো কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থী হওয়ার আর হাবিবুল্লাহ নিয়ন এবং তানভীর আহমেদ রিমন এর স্বপ্ন ছিলো বুয়েটের ইলেক্ট্রনিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগ।

কিন্তু ভাগ্য তাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলো অন্য কিছু। ভাগ্যক্রমে এই চার শিক্ষার্থী হয়ে যান সহপাঠী,স্বপ্ন আলাদা থাকলেও চারজনের মধ্যেই ছিলো গবেষণার ইচ্ছে, আবিষ্কারের নেশা, স্বপ্ন ছিলো প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্বজয়ের আর সেই স্বপ্ন থেকেই তারা ২০১৭ সালে তৈরি করেন "রোবো গ্যাং", আর ২০১৮ সালে গঠন করেন "বশেমুরবিপ্রবি রোবোটিকস এন্ড রিসার্চ ক্লাব"।

যাত্রাপথ সহজ ছিলো না এই তরুণদের,দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো তাদের বিভাগেও ব্যাবহারিকের তুলনায় তাত্ত্বিক শিক্ষাতেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হতো তাই অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়া এবং খারাপ ফলাফলের ভয়ে গবেষণা বন্ধ করে দেয়,তবে এই চার শিক্ষার্থী ভয়ের কাছে স্বপ্নকে হেরে যেতে দেননি।

তাদের উৎসাহের কারণে বিভাগের শিক্ষকরাও তাদের সহযোগিতা করতে শুরু করেন,বিশেষ করে ইইই বিভাগের সাবেক সভাপতি জপতোশ মন্ডল সর্বদাই এই শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে।

চেষ্টা এবং মেধার সাহায্যে যাত্রা শুরুর মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত জাতীয় সাইন্স ফেস্ট-২০১৭ তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে "রোবোগ্যাং" শুরু করে তার সাফল্যের যাত্রা,পরবর্তীতে এই দলটি দ্বিতীয় রানার্সআপ হয় "ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এসোনেন্স-২০১৭তে, সাফল্যমন্ডিত ২০১৭ কাটানোর পর ২০১৮তে প্রথমবার ব্যার্থতার মুখোমুখি হয় রোবোগ্যাং, মিলিটারী ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় অবতরণের স্থান নির্ধারণে ভুল হওয়ায় বিদ্ধস্ত হয় তাদের ড্রোনটি।

তবে ব্যার্থতা তাদের থামাতে পারেনি, নিরলস পরিশ্রমে তারা তাদের ড্রোনটিন পুনঃনির্মান এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করেন। আর এই পুননির্মিত ড্রোনটি নিয়েই তারা চ্যাম্পিয়ন হন রোবো কার্নিভালে।

তাদের আবিষ্কৃত এ ড্রোনটির সাহায্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বন্যা কবলিত বা দূর্গত পাহাড়ি এলাকায় ঔষধ ও ত্রান সামগ্রী সরবরাহ, নির্দিষ্ট এলাকা টহল দেয়া সহ ভালো রেজুলেশনের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচার করা সম্ভব। এমনকি এই ড্রোনটি গোয়েন্দা সংস্হা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলা রোধে ট্রাকিংয়ের কাজও করতে সক্ষম।

রোবোগ্যাং টিম তাদের ড্রোনের এয়ারফ্রেম তৈরী করেছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে আকাশি গাছের কাঠ দিয়ে। প্রসেসিং ইউনিট হিসেবে ব্যাবহার করেছে এআরএম কর্টেক্স এম-৩ প্রসেসর, সেনসর হিসেবে ব্যবহার করেছে এক্সিলেরোমিটার, গাইরোস্কোপ, ব্যারোমিটার এবং জিপিএস সিস্টেম যা স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহিত আর হার্ডওয়্যার পরিচালনায় ব্যবহার করেছে নিজস্ব তৈরী উচ্চ ক্ষমতাসমপন্ন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার।

তাদের তৈরী ড্রোনের সমমানের ড্রোন কিনতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারে খরচ করতে হবে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্ত তারা ঐ একই সুবিধা সম্পন্ন ড্রোন তৈরী করেছে মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা ব্যায়ে। আমাদের দেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জন্য যে সকল ড্রোন ব্যবহার করা হয় সেগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়, এগুলো আমদানি করা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল তেমনি এসকল ড্রোনে তথ্যসংগ্রহের জন্য ওয়ারলেস সিস্টেম ব্যবহার করায় রপ্তানিকারক দেশ কর্তৃক আমাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচুরির আশঙ্কা থেকে যায়, যা আমাদের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

'রোবো গ্যাং' টিমের সদস্যদের মতে সরকারের সহযোগীতা পেলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযয়ী স্বল্প খরচে উন্নত ড্রোন নির্মাণ সম্ভব, এতে একদিকে যেমন অর্থের অপচয় রোধ হবে অপরদিকে নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত হবে, পাশাপাশি দেশের শিক্ষার্থীরাও এধরনের আবিষ্কার এবং গবেষণায় উৎসাহী হবে।

মেধাবী এই চার শিক্ষার্থী বর্তমানে তাদের ড্রোনটির প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যস্ত। তাদের স্বপ্ন অধিকতর গবেষণার মাধ্যমে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় রোবট ও ড্রোন তৈরির এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সুপরিচিত করে তোলার।

তবে তার জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের সহযোগিতা। এখন পর্যন্ত এই চার শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে ড্রোন তৈরিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু অধিকতর গবেষণা এবং উন্নতমানের রোবট তৈরির জন্য যে কাঁচামালের প্রয়োজন তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব।

তাই এই শিক্ষার্থীরা আশা করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শীঘ্রই তাদের এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে এবং তারা তাদের গবেষণাকার্যের মাধ্যমে শুধুমাত্র জাতীয় নয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করবে। পাশাপাশি তারা আশা করেন সকল ধরনের গবেষণাকার্যে সরকারি সহযোগিতা এবং দেশের মেধাশক্তির সঠিক ব্যবহারের।

দেশীয় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের কাছে একসময় হয়ে উঠবে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এমনটাই প্রত্যাশা এই তরুণদের।

 

ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।